চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য প্রস্তাবিত ২ হাজার ২৬০ কোটি টাকার বাজেটটি একদিকে যেমন আধুনিক নগর গড়ার স্বপ্ন দেখাচ্ছে, অন্যদিকে এর বাস্তবায়ন নিয়ে তৈরি হয়েছে গভীর সংশয়। বাজেটটিতে নগর উন্নয়ন, জলাবদ্ধতা নিরসন, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং অবকাঠামো উন্নয়নের ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে, যা মোট বরাদ্দের প্রায় ৪৬ শতাংশ দখল করে আছে। মেয়র ডা. শাহাদাৎ হোসেনের নেতৃত্বাধীন এই করপোরেশন প্রশাসনিক ডিজিটালাইজেশন, ১০ লাখ বৃক্ষরোপণ এবং হকারদের পুনর্বাসনের জন্য আন্ডারগ্রাউন্ড মার্কেট তৈরির মতো সাহসী কিছু উদ্যোগ নিয়েছে। এছাড়া করপোরেশনের দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত দেনা পরিশোধ ও আর্থিক শৃঙ্খলা ফেরানোর প্রতিশ্রুতি নগরবাসীর মনে কিছুটা আশার সঞ্চার করেছে।
তবে এই বাজেটের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হলো এর নিজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা। গত অর্থবছরের ৭৩৬ কোটি টাকার আয়ের বিপরীতে এবার ১ হাজার ১৯৭ কোটি টাকা আয়ের যে লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে, তা অত্যন্ত উচ্চাভিলাষী। রাজস্ব আহরণের কার্যকর কৌশল বা প্রশাসনিক সক্ষমতা বৃদ্ধির সুনির্দিষ্ট রূপরেখা না থাকায় এই লক্ষ্যমাত্রা অর্জন নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। একই সঙ্গে মোট বাজেটের ৪৫ শতাংশই ব্যয় হবে বেতন-ভাতা ও ঋণ পরিশোধের মতো পরিচালন খাতে। ফলে উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডের জন্য পর্যাপ্ত তহবিল নিশ্চিত করা এবং তা স্বচ্ছতার সঙ্গে বাস্তবায়ন করা করপোরেশনের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে। অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, অতীতে উন্নয়ন প্রকল্পের বড় একটি অংশ বাস্তবায়নের মুখ দেখেনি, যা নাগরিকদের আস্থাকে সংকটে ফেলেছে।
জলাবদ্ধতা চট্টগ্রামের দীর্ঘস্থায়ী ও প্রধানতম নাগরিক সংকট। এবারের বাজেটে এ খাতে বরাদ্দ থাকলেও কোন কোন খাল বা ড্রেন সংস্কারে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে, সে বিষয়ে সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা নেই। অতীতেও জলাবদ্ধতা নিরসনে বিপুল অর্থ ব্যয় হয়েছে, কিন্তু সুফল মেলেনি। একইভাবে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও মশক নিধনের ক্ষেত্রেও বাজেটে আধুনিক ও টেকসই পরিকল্পনার অভাব স্পষ্ট। শুধু যন্ত্রপাতি কেনা বা ওষুধ ছিটানোই যথেষ্ট নয়; বরং বর্জ্য পৃথকীকরণ, পুনর্ব্যবহার এবং সমন্বিত জনস্বাস্থ্য কর্মসূচি গ্রহণ করা এখন সময়ের দাবি।
পরিশেষে, আধুনিক ও পরিবেশবান্ধব চট্টগ্রাম গড়ার যে আকাঙ্ক্ষা এই বাজেটে প্রতিফলিত হয়েছে, তা প্রশংসনীয়। তবে কেবল বড় অঙ্কের বরাদ্দই নগরবাসীর সমস্যার সমাধান করতে পারবে না। প্রকল্প বাস্তবায়নে স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা নিশ্চিতকরণ এবং নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে কাজ সম্পন্ন করাই হবে এই বাজেটের আসল পরীক্ষা। যদি রাজস্ব আহরণ ও বাস্তবায়ন কৌশলে আমূল পরিবর্তন আনা না যায়, তবে এই বাজেট কেবল কাগজেই সীমাবদ্ধ থেকে যাবে এবং বর্ষার প্রথম বৃষ্টিতেই সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা ধুয়ে মুছে যাওয়ার আশঙ্কা থেকেই যাবে।
দেশনেত্র দৃষ্টি ছাড়িয়ে