বাংলাদেশের শিল্পাঙ্গনে শোকের ছায়া ফেলে না ফেরার দেশে পাড়ি জমিয়েছেন বরেণ্য চিত্রশিল্পী আতিয়া ইসলাম। বৃহস্পতিবার বিকেলে রাজধানীর ধানমন্ডির একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। দীর্ঘ সময় ধরে তিনি ক্যানসার নামক মরণব্যাধির সাথে লড়াই করছিলেন। তাঁর মৃত্যুর মধ্য দিয়ে দেশের সমকালীন চিত্রকলায় এক সাহসী ও প্রতিবাদী কণ্ঠস্বর স্তব্ধ হয়ে গেল। আতিয়া ইসলাম কেবল একজন শিল্পীই ছিলেন না, বরং তিনি ছিলেন পিতৃতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থা ও নারী নিপীড়নের বিরুদ্ধে এক আপসহীন যোদ্ধা।
১৯৬২ সালে ঢাকায় জন্মগ্রহণকারী আতিয়া ইসলাম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদ থেকে ১৯৮২ সালে ড্রয়িং অ্যান্ড পেইন্টিং বিষয়ে বিএফএ এবং ১৯৮৫ সালে এমএফএ ডিগ্রি সম্পন্ন করেন। ছাত্রজীবন থেকেই তিনি সৃজনশীল ও সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডে সক্রিয় ছিলেন, যার প্রতিফলন ঘটেছিল ১৯৮১-৮২ শিক্ষাবর্ষে চারুকলা ছাত্র সংসদের সাংস্কৃতিক সম্পাদক হিসেবে তাঁর দায়িত্ব পালনের মধ্য দিয়ে। কর্মজীবনে তিনি ইংরেজি মাধ্যম স্কুল সানবিমসে চিত্রাঙ্কন শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন এবং শিশুদের শিল্পের আলোয় গড়ে তুলতে ধানমন্ডিতে ‘ঝাপি স্কুল অব আর্ট’ প্রতিষ্ঠা করেন।
আতিয়া ইসলামের শিল্পকর্মের মূল উপজীব্য ছিল সমাজ ও রাজনীতি। ক্যানভাসে উজ্জ্বল রঙের ব্যবহার এবং রূপকধর্মী ও ব্যঙ্গাত্মক উপস্থাপনার মাধ্যমে তিনি সমাজের অসংগতি, নারীর প্রতি বৈষম্য, সহিংসতা এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের মতো বিষয়গুলোকে তীব্রভাবে ফুটিয়ে তুলতেন। নব্বইয়ের দশকে নারী শিল্পীদের মধ্যে তিনি তাঁর কাজের স্বাতন্ত্র্য ও স্পষ্ট বক্তব্যের জন্য বিদগ্ধ মহলে প্রশংসিত হন। গ্যালারি ২১, বেঙ্গল গ্যালারি ও আলিয়ঁস ফ্রঁসেজসহ দেশে-বিদেশে তাঁর বহু একক ও দলীয় প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হয়েছে। ২০১৮ সালে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি আয়োজিত ১৮তম এশিয়ান আর্ট বিয়েনালে তিনি প্রধান পুরস্কার লাভ করেন, যা তাঁর শিল্পীসত্তার শ্রেষ্ঠত্বের স্বীকৃতি।
ব্যক্তিগত জীবনে তিনি শিল্পী হাসান মাহমুদের সহধর্মিণী ছিলেন এবং দুই কন্যা সন্তানের জননী ছিলেন। আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন চিত্রশিল্পী শাহাবুদ্দিন আহমেদের শ্যালিকা আতিয়া ইসলাম আজিমপুর কবরস্থানে চিরনিদ্রায় শায়িত হবেন বলে পারিবারিক সূত্রে জানানো হয়েছে। তাঁর মৃত্যুতে শিল্পবোদ্ধা ও সহকর্মীদের মধ্যে গভীর শোকের ছায়া নেমে এসেছে। শিল্পের মাধ্যমে সমাজ পরিবর্তনের যে স্বপ্ন তিনি দেখেছিলেন, তা আগামী প্রজন্মের শিল্পীদের জন্য প্রেরণার উৎস হয়ে থাকবে।
দেশনেত্র দৃষ্টি ছাড়িয়ে