মিয়ানমারের উত্তর প্রান্তের কাচিন রাজ্যে থমকে থাকা অত্যন্ত বিতর্কিত ও বিশাল জলবিদ্যুৎ প্রকল্প ‘মিতসোন বাঁধ’ পুনরায় চালুর উদ্যোগ নিয়েছে দেশটির সামরিক জান্তা সরকার। প্রায় ৩৬০ কোটি ডলারের এই প্রকল্পটির কাজ প্রায় এক দশক আগে স্থানীয়দের তীব্র প্রতিবাদ ও পরিবেশগত ঝুঁকির কারণে স্থগিত করা হয়েছিল। তবে সম্প্রতি জান্তাপ্রধান মিন অং হ্লাইংয়ের চীন সফরের পরপরই প্রকল্পটি পুনরুজ্জীবিত করার বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় এসেছে। সূত্র অনুযায়ী, সরকার আগামী আট বছরের মধ্যে এই বিশাল কর্মযজ্ঞ শেষ করার পরিকল্পনা করছে।
২০০৯ সালের হিসাব অনুযায়ী ৩৬০ কোটি ডলারের এই প্রকল্পটি বর্তমানে বাস্তবায়ন করতে প্রায় ১১৫০ কোটি ডলার ব্যয় হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। প্রকল্পটি মালি ও নমাই নদীর মোহনায় ১৫২ মিটার উচ্চতার একটি বিশাল বাঁধ নির্মাণের পরিকল্পনা নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে। এর আগে ২০১১ সালে পরিবেশবাদী সংগঠন ও স্থানীয় জনগণের প্রবল আন্দোলনের মুখে তৎকালীন সরকার এর নির্মাণকাজ বন্ধ করতে বাধ্য হয়েছিল। সেই সময় অভিযোগ উঠেছিল যে, এখান থেকে উৎপাদিত ৯০ শতাংশ বিদ্যুৎ প্রতিবেশী চীনে রপ্তানি করা হবে, যা মিয়ানমারের নিজস্ব চাহিদার চেয়ে চীনের স্বার্থকেই বেশি গুরুত্ব দেয়।
বর্তমান জান্তা সরকার দাবি করছে যে, তারা আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে পরিবেশগত ঝুঁকিগুলো কমিয়ে আনতে সক্ষম হবে। কাচিন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী খেত তেইন নান বিভিন্ন গোপন বৈঠকে প্রকল্পটিকে একটি ‘ঐতিহাসিক অর্জন’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। তবে মিয়ানমারের বর্তমান অস্থিতিশীল রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও গৃহযুদ্ধের আবহে এই প্রকল্প নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। ৪৯টি নাগরিক সংগঠন ইতিমধ্যে এই প্রকল্পের বিরুদ্ধে সরব হয়েছে এবং একে জনগণের সম্পদ ও বাস্তুসংস্থানের জন্য ধ্বংসাত্মক বলে অভিহিত করেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ভূমিকম্পপ্রবণ এলাকায় এমন বিশাল বাঁধ নির্মাণের ঝুঁকি অনেক বেশি। বিশেষ করে গত মার্চ মাসে শক্তিশালী ভূমিকম্পের পর স্থানীয়দের মধ্যে ভীতি বেড়েছে। এছাড়া, সামরিক শাসনের অধীনে থাকা এই প্রকল্পে জনমতের চেয়ে রাজনৈতিক ও ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থই মুখ্য হয়ে উঠেছে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন। প্রকল্পটি শেষ পর্যন্ত বাস্তবায়িত হলে তা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অন্যতম বড় জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রে পরিণত হবে, তবে এটি মিয়ানমারের দীর্ঘমেয়াদী পরিবেশগত ও সামাজিক স্থিতিশীলতার ওপর কতটা প্রভাব ফেলবে, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।
দেশনেত্র দৃষ্টি ছাড়িয়ে