আনন্দময় পরিবেশে বাড়ে সন্তানের মনোযোগ: প্রযুক্তির যুগে অভিভাবকের করণীয় কী?

আনন্দময় পরিবেশে বাড়ে সন্তানের মনোযোগ: প্রযুক্তির যুগে অভিভাবকের করণীয় কী?

প্রথম আলো ট্রাস্টের নিয়মিত আয়োজন, বিনামূল্যে মাদকবিরোধী পরামর্শ সহায়তা সভার অংশ হিসেবে সম্প্রতি অনুষ্ঠিত হলো ১৭৫তম অনলাইন পরামর্শ সহায়তা সভা। গত ৪ মার্চ ২০২৬ তারিখে প্রথম আলোর কারওয়ান বাজার কার্যালয়ে আয়োজিত এই গুরুত্বপূর্ণ সভায় প্রধান আলোচক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজের সহকারী অধ্যাপক (সাইকিয়াট্রি) ডা. জোবায়ের মিয়া। এবারের সভার মূল বিষয় ছিল ‘অমনোযোগী সন্তান: অভিভাবকের করণীয়’। ডা. জোবায়ের মিয়া তাঁর আলোচনায় সন্তানের মনোযোগ বৃদ্ধিতে আনন্দময় পরিবেশের অপরিহার্যতা এবং প্রযুক্তির যুগে অভিভাবকদের ভূমিকা নিয়ে বিস্তারিত পরামর্শ দেন।

বর্তমান সময়ে শিশুদের মধ্যে অমনোযোগিতা একটি প্রকট সমস্যা হিসেবে দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে যখন হাতে হাতে ডিভাইস, তখন এই সমস্যা আরও গুরুতর রূপ নিচ্ছে। ডা. জোবায়ের মিয়া তার বক্তব্যে এই উদ্বেগের কথা তুলে ধরে বলেন, “যে সময়টাতে বাচ্চাদের একটু মনোযোগী হওয়া উচিত, সেখানে তারা একটু কম মনোযোগী হচ্ছে। আর এই টেকনোলজির সময় যখন ডিভাইস সবার হাতে হাতে তখন এটা একটু বেশি কিনা?” তিনি প্রশ্ন তোলেন যে, আসলে কেন শিশুরা অমনোযোগী হয় এবং তাদের মনোযোগের ঘাটতির মূল কারণগুলো কী।

বিশেষজ্ঞের মতে, শিশুরা মূলত দেখে দেখে শেখে। যদি তারা একটি আনন্দময় ও ইতিবাচক পরিবেশ পায়, তবে তারা প্রফুল্ল থাকবে এবং স্বাভাবিকভাবেই কথা শুনবে ও পড়ালেখায় মনোযোগ দেবে। এর বিপরীতে, যদি পড়ালেখা নিরানন্দ হয়, যদি তা চাপিয়ে দেওয়া হয়, বা ঘরের পরিবেশ অশান্ত, অস্থিরতা ও শৃঙ্খলার অভাবে পূর্ণ থাকে, তবে শিশুদের মনোযোগ বিঘ্নিত হয়। ডা. জোবায়ের মিয়া জোর দিয়ে বলেন, “সন্তানরা যদি আনন্দময় পরিবেশ পায় তাহলে আনন্দে থাকবে এবং তারা কথা শুনবে ও মনোযোগ দিবে।” এই আনন্দময় পরিবেশের অভাবই অনেক সময় অমনোযোগিতার কারণ।

ডা. জোবায়ের মিয়া নব্বইয়ের দশক বা তার পরবর্তী সময়ের শিশুদের সঙ্গে বর্তমান প্রজন্মের শিশুদের মনোযোগের তুলনামূলক বিশ্লেষণ করেন। তিনি বলেন, অতীতে শিশুদের মনোযোগের অভাব থাকলেও তা ছিল নির্দিষ্ট কিছু বিনোদনের মধ্যে সীমাবদ্ধ, যেমন সপ্তাহে এক ঘণ্টার জন্য সাদা-কালো টেলিভিশনে কোনো পছন্দের অনুষ্ঠান বা সিনেমা দেখা। এছাড়া শীতকালে যাত্রা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান বা ফুটবল খেলার মতো কিছু সামাজিক ও সাংস্কৃতিক আয়োজন তাদের কিছু সময়ের জন্য পড়ালেখা থেকে দূরে রাখলেও, পরবর্তীতে তারা পূর্ণ উদ্যমে পড়ালেখায় ফিরত এবং এতে তাদের স্মরণশক্তি আরও বাড়ত। কিন্তু বর্তমান সময়ে চিত্রটি ভিন্ন। শিশুরা এখন ঘরমুখী। স্কুল বা কলেজ থেকে ফিরে তারা সরাসরি ঘরে ঢুকে ট্যাব, মোবাইল বা ল্যাপটপের মতো ডিভাইসে মগ্ন হয়ে পড়ে। এমনকি খাবার খাওয়ার সময়ও তারা ডিভাইসে চোখ রাখে, যা তাদের মনোযোগকে খণ্ড-বিখণ্ড করে দিচ্ছে। ডিভাইসকে তিনি অমনোযোগিতার অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেন।

এই পরিস্থিতিতে অভিভাবকদের করণীয় কী, সে বিষয়ে ডা. জোবায়ের মিয়া সুনির্দিষ্ট কিছু পরামর্শ দেন। তিনি শৃঙ্খলার ওপর জোর দেন এবং ডিভাইস ব্যবহারের জন্য সময় নির্ধারণ করে দেওয়ার কথা বলেন। তার মতে, অভিভাবকদের প্রথমে চিহ্নিত করতে হবে যে সন্তানের অমনোযোগিতার মূল কারণ কী – সে কি ডিভাইসে আসক্ত, নাকি বন্ধু-বান্ধবদের সাথে অতিরিক্ত সময় কাটাচ্ছে, নাকি তার পড়ালেখার বিষয়গুলো পছন্দ নয়। এই কারণগুলো চিহ্নিত করে সে অনুযায়ী পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। একটি আনন্দময় এবং চাপমুক্ত শিক্ষার পরিবেশ তৈরি করা, শিশুদের পছন্দের বিষয়গুলো জানতে চাওয়া এবং তাদের সঙ্গে খোলামেলা আলোচনা করাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

পরিশেষে ডা. জোবায়ের মিয়া বলেন, সন্তানকে কেবল পড়ালেখায় চাপ না দিয়ে, বরং তাদের জন্য একটি সুস্থ, আনন্দময় ও উদ্দীপনামূলক পরিবেশ নিশ্চিত করাই অভিভাবকদের প্রধান কর্তব্য। সঠিক নির্দেশনা, সময়োপযোগী পদক্ষেপ এবং প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করার মাধ্যমে শিশুদের অমনোযোগিতা অনেকাংশে হ্রাস করা সম্ভব। এতে শিশুরা কেবল পড়ালেখায় মনোযোগী হবে না, বরং সামগ্রিকভাবে তাদের মানসিক সুস্থতা ও বিকাশও নিশ্চিত হবে।

এছাড়াও

ভেনেজুয়েলার ভূমিকম্প: ধ্বংসস্তূপের নিচে মায়ের আত্মত্যাগ, অলৌকিকভাবে বাঁচল শিশুসন্তান

ভেনেজুয়েলার ভূমিকম্প: ধ্বংসস্তূপের নিচে মায়ের আত্মত্যাগ, অলৌকিকভাবে বাঁচল শিশুসন্তান

ভেনেজুয়েলায় আঘাত হানা ভয়াবহ জোড়া ভূমিকম্পে যখন চারিদিকে কেবল ধ্বংস আর মৃত্যুর হাহাকার, তখন এক …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *