ভারতের উগ্র হিন্দুত্ববাদী রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ (আরএসএস) কেন অন্য অসংখ্য সংগঠনের মতো নিবন্ধন এবং জনগণের কাছে জবাবদিহির আওতায় আসবে না – কর্ণাটকের মন্ত্রী প্রিয়াঙ্ক খাড়গের সাম্প্রতিক এমন এক মন্তব্য আবারও একটি রাজনৈতিক বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। এই মন্তব্যের পর আরএসএস-এর আর্থিক স্বচ্ছতা এবং এর জবাবদিহিতা নিয়ে দীর্ঘদিনের উপেক্ষিত প্রশ্নগুলো নতুন করে সামনে এসেছে। আরএসএস-এর সমর্থকেরা এই প্রস্তাবটিকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে উড়িয়ে দিয়েছেন, অন্যদিকে সমালোচকেরা একে ভারতের অন্যতম প্রভাবশালী একটি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিনের জমে থাকা এক চ্যালেঞ্জ হিসেবে স্বাগত জানিয়েছেন।
এই বিতর্কে নতুন মাত্রা যোগ করেছেন পার্থ ব্যানার্জি, যিনি প্রায় ২০ বছর হিন্দুত্ববাদী আরএসএস, এবিভিপি এবং বিজেপিতে সক্রিয়ভাবে কাজ করার পর সেই আন্দোলন ছেড়ে দিয়েছেন। তাঁর স্মৃতিকথা ‘ইন দ্য বেলি অব দ্য বিস্ট’ (১৯৯৮) এবং ‘গান্ধীস কিলার্স ইন্ডিয়াস রুলার্স’ (২০১৮) বইগুলোতে তিনি সংঘ পরিবারের ভেতরের অভিজ্ঞতা এবং প্রাতিষ্ঠানিক স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। ব্যানার্জির মতে, প্রিয়াঙ্ক খাড়গের মন্তব্য কেবল একটি রাজনৈতিক বাগযুদ্ধ নয়, বরং গণতন্ত্রে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং বিশ্বাসের মতো কিছু গুরুত্বপূর্ণ অথচ উপেক্ষিত প্রশ্নকে সামনে এনেছে।
ব্যানার্জি তাঁর ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার আলোকে আরএসএস-এর আর্থিক লেনদেনের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক তুলে ধরেছেন – ‘গুরু দক্ষিণা’। এটি আরএসএস কর্মীদের দ্বারা গেরুয়া পতাকার প্রতি একটি আনুষ্ঠানিক নিবেদন, যা প্রতীকীভাবে সংগঠনের ‘গুরু’কে প্রতিনিধিত্ব করে। তাঁর বর্ণনামতে, আরএসএস-এ থাকার সময় স্বেচ্ছাসেবকদের তাঁদের ব্যক্তিগত পরিস্থিতি অনুযায়ী নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ অবদান রাখার কথা বলা হতো। এই অর্থ একটি খামের ভেতরে রেখে অনুষ্ঠানের সময় গেরুয়া পতাকার নিচে নিবেদন করা হতো, এবং স্থানীয় দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিরা সংগৃহীত অর্থ গণনা করতেন। তবে, ব্যানার্জি উল্লেখ করেছেন যে এই সংগৃহীত অর্থ কীভাবে একত্রিত করা হয়, তার হিসাব কীভাবে রাখা হয় বা কীভাবে তা জনসমক্ষে প্রকাশ করা হয়, সে সম্পর্কে কোনো প্রকাশ্য আলোচনা বা স্বচ্ছতা ছিল না। এই আর্থিক অস্বচ্ছতাই তাঁর লেখায় উত্থাপিত মূল প্রশ্নগুলোর একটি।
আধুনিক গণতন্ত্রে, সমাজে উল্লেখযোগ্য প্রভাব বিস্তারকারী সংগঠনগুলোর একটি সুনির্দিষ্ট আইনি কাঠামো থাকা, প্রচলিত আইন মেনে চলা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী আর্থিক হিসাব ও তথ্য প্রকাশ করা প্রত্যাশিত। আরএসএস, যার সারা ভারতে ৮৩ হাজার শাখা রয়েছে এবং যা বর্তমানে ভারতের ক্ষমতার নিয়ন্ত্রক হয়ে উঠেছে, তার ক্ষেত্রে এই নীতি কেন প্রযোজ্য হবে না, সেই প্রশ্নই এখন জোরালো হচ্ছে। সমালোচকদের মতে, প্রভাব ও জবাবদিহি একসঙ্গে বৃদ্ধি পাওয়া উচিত, এবং আরএসএস-এর মতো একটি প্রভাবশালী প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রেও এর ব্যতিক্রম হওয়া উচিত নয়।
পার্থ ব্যানার্জি আরও অভিযোগ করেছেন যে আরএসএস-এর অভ্যন্তরীণ প্রাতিষ্ঠানিক স্বচ্ছতার প্রশ্নটি আশ্চর্যজনকভাবে জনসাধারণের আলোচনায় সীমিত রয়ে গেছে। তিনি এটিকে ‘বর্জনের সাংবাদিকতা’ (journalism of exclusion) হিসেবে বর্ণনা করেছেন, যেখানে কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ইচ্ছাকৃতভাবে বা অনিচ্ছাকৃতভাবে জনবিতর্কের কেন্দ্র থেকে দূরে রাখা হয়। তাঁর মতে, সাংবাদিকেরা সবাই মিলে ষড়যন্ত্র করছেন তা নয়, বরং এটি একটি পুনরাবৃত্তিমূলক ধরন, যেখানে আরএসএস-এর মতো শক্তিশালী প্রতিষ্ঠানের আর্থিক ও প্রশাসনিক স্বচ্ছতার মতো বিষয়গুলো মূলধারার গণমাধ্যমের মনোযোগ খুব কমই পায়।
প্রিয়াঙ্ক খাড়গের মন্তব্য তাই কেবল কর্ণাটক বা কোনো দলীয় শত্রুতার গণ্ডি ছাড়িয়ে যায়। এটি ভারতের সাংবিধানিক গণতন্ত্রের সামনে একটি বৃহত্তর প্রশ্ন নিয়ে এসেছে: কীভাবে এমন প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং জনগণের বিশ্বাসকে উৎসাহিত করা হবে, যারা জাতীয় জীবনের ওপর ব্যাপক প্রভাব খাটায়? এই প্রশ্নটি কোনো প্রতিষ্ঠানের জনপ্রিয়তা, বয়স, বা বর্তমান সরকারের সঙ্গে তার সম্পর্ক নির্বিশেষে সবার ক্ষেত্রে সমানভাবে প্রযোজ্য হওয়া উচিত – এমনটাই মত দিয়েছেন বিশ্লেষকরা।
দেশনেত্র দৃষ্টি ছাড়িয়ে