ঢাকা: “এ সমস্ত প্রশ্ন করবেন না, খুব বিব্রতবোধ করি।” – একজন সাংবাদিকের প্রশ্নের জবাবে অকস্মাৎ এই মন্তব্য করে দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ. কে. আব্দুল মোমেন গণমাধ্যম কর্মীদের মধ্যে এক মিশ্র প্রতিক্রিয়ার জন্ম দিয়েছেন। মঙ্গলবার (১লা অক্টোবর, ২০২৪) পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে এ ঘটনা ঘটে, যা তাৎক্ষণিকভাবে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে এবং গণমাধ্যম ও সরকারের মধ্যে সম্পর্কের সংবেদনশীলতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে।
মঙ্গলবারের নির্ধারিত সংবাদ সম্মেলনটি মূলত বাংলাদেশের সাম্প্রতিক কূটনৈতিক সাফল্য, আসন্ন আন্তর্জাতিক সম্মেলন এবং একটি প্রতিবেশী দেশের সাথে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক জোরদার করার বিষয়ে আলোচনা করার জন্য ডাকা হয়েছিল। মন্ত্রী তার বক্তৃতায় দেশের পররাষ্ট্রনীতির বিভিন্ন দিক, অর্থনৈতিক কূটনীতিতে অগ্রগতি এবং আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বাংলাদেশের ক্রমবর্ধমান ভূমিকা তুলে ধরছিলেন। পরিবেশ ছিল স্বাভাবিক এবং প্রশ্নোত্তর পর্বের জন্য প্রস্তুত।
প্রশ্নোত্তর পর্বের এক পর্যায়ে, একজন জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে উদ্দেশ্য করে প্রশ্ন করেন: “সম্প্রতি বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মহল থেকে দেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি এবং আসন্ন জাতীয় নির্বাচন নিয়ে যে উদ্বেগ প্রকাশ করা হচ্ছে, বিশেষ করে পশ্চিমা দেশগুলো থেকে অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে, সে বিষয়ে সরকারের অবস্থান কী? এবং এটি কি বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তিতে কোনো প্রভাব ফেলছে?” প্রশ্নটি শোনার পর পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে কিছুটা অস্বস্তিতে দেখা যায়। তিনি কয়েক মুহূর্ত নীরব থেকে সরাসরি ওই সাংবাদিককে উদ্দেশ্য করে বলেন, “এ সমস্ত প্রশ্ন করবেন না, খুব বিব্রতবোধ করি। অন্য প্রশ্ন করুন।” মন্ত্রীর এই অকপট স্বীকারোক্তি উপস্থিত অন্যান্য সাংবাদিক এবং কর্মকর্তাদের মধ্যে বিস্ময় তৈরি করে।
মন্ত্রীর এই মন্তব্য এমন এক সময়ে এলো যখন দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি, মানবাধিকার পরিস্থিতি এবং আগামী জাতীয় নির্বাচনকে ঘিরে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বেশ কিছু প্রশ্ন ও আলোচনা চলছে। বিশেষ করে, পশ্চিমা দেশগুলোর পক্ষ থেকে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া এবং মানবাধিকার সুরক্ষা নিয়ে কড়া নজরদারি এবং কিছু আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রকাশিত প্রতিবেদন সরকারের ওপর এক ধরনের চাপ সৃষ্টি করেছে। এ ধরনের সংবেদনশীল বিষয়ে সরকারের শীর্ষ পর্যায়ের একজন মন্ত্রীর কাছ থেকে এমন প্রতিক্রিয়া কূটনৈতিক মহলে এবং জনমনে বিভিন্ন প্রশ্নের জন্ম দিচ্ছে। এটি কি সরকারের পক্ষ থেকে নির্দিষ্ট কিছু বিষয়ে আলোচনা এড়িয়ে যাওয়ার কৌশল, নাকি অস্বস্তিকর পরিস্থিতি মোকাবিলায় মন্ত্রীর ব্যক্তিগত প্রতিক্রিয়া, তা নিয়ে আলোচনা চলছে।
গণমাধ্যম বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, একজন দায়িত্বশীল মন্ত্রীর কাছ থেকে এমন মন্তব্য গণমাধ্যমের স্বাধীনতা এবং তথ্য জানার অধিকারের ওপর এক ধরনের সীমাবদ্ধতার ইঙ্গিত দেয়। সাংবাদিকদের কাজই হলো জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে প্রশ্ন করা, এমনকি তা যদি সরকারের জন্য অস্বস্তিকরও হয়। এই ধরনের মন্তব্য ভবিষ্যতে সাংবাদিকদের জন্য নির্দিষ্ট কিছু বিষয়ে প্রশ্ন করা থেকে বিরত থাকার একটি বার্তা দিতে পারে, যা একটি গণতান্ত্রিক সমাজে কাম্য নয়।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, মন্ত্রীর এই ‘বিব্রতবোধ’ হয়তো সরকারের অস্বস্তিকর দিকটিকেই তুলে ধরেছে। এটি সরকারের স্বচ্ছতা নিয়েও প্রশ্ন তুলতে পারে। তাদের মতে, সরকারের উচিত সব ধরনের প্রশ্নের মুখোমুখি হওয়া এবং গঠনমূলক জবাবদিহিতার মাধ্যমে জনমনে আস্থা তৈরি করা। এ ধরনের মন্তব্য বরং উল্টো ফল বয়ে আনতে পারে এবং জনমনে ভুল বার্তা পৌঁছাতে পারে।
এই ঘটনাটি গণমাধ্যম ও সরকারের মধ্যে সম্পর্কের জটিলতা এবং সংবেদনশীল বিষয়গুলো মোকাবিলায় সরকারের কৌশল নিয়ে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। ভবিষ্যতে এ ধরনের পরিস্থিতি কীভাবে সামলানো হয় এবং সরকার কীভাবে গণমাধ্যমের প্রশ্নগুলোকে গ্রহণ করে, তা দেখার বিষয়। এই ঘটনা নিঃসন্দেহে দেশের রাজনৈতিক ও গণমাধ্যম অঙ্গনে দীর্ঘ সময় ধরে আলোচিত হবে।
দেশনেত্র দৃষ্টি ছাড়িয়ে