কুড়িগ্রামের চিলমারী উপজেলার চরাঞ্চলে ব্রহ্মপুত্র নদের ভাঙন ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে। গত সাত দিনে উপজেলার চর কড়াইবরিশাল, বিশারপাড়া আশ্রয়ণ প্রকল্প ও চর শাখাহাতি এলাকায় অন্তত ৭০টি পরিবার তাদের শেষ সম্বলটুকু হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে পড়েছে। এছাড়া আরও প্রায় ৩০০টি পরিবার বর্তমানে ভাঙনের চরম ঝুঁকিতে দিন কাটাচ্ছে। দীর্ঘ সাত দশকের জীবনে অন্তত ২৫ বার নদীভাঙনের শিকার হওয়া ৭০ বছর বয়সী মমেনা বেগমের হাহাকার যেন পুরো চরাঞ্চলের মানুষের প্রতিচ্ছবি। একসময়ের সচ্ছল জীবন আজ ব্রহ্মপুত্রের গর্ভে বিলীন। মমেনা বেগম জানান, চোখের সামনেই তাদের আবাদি জমি ও বসতভিটা নদীগর্ভে চলে গেছে। এখন টিকে থাকার লড়াইটাই তাদের একমাত্র সম্বল।
ভাঙনকবলিত এলাকার মানুষের কষ্টের সীমা নেই। দিনমজুর ধলু মিয়ার স্ত্রী লাভলী বেগম জানান, হঠাৎ ভাঙন শুরু হওয়ায় ঘর সরানোর সময়টুকুও পাননি তারা। আত্মীয়দের পাঠানো খাবার খেয়ে কোনোমতে বেঁচে থাকা এই মানুষগুলো এখন ঘর সরানোর নতুন জায়গা খুঁজে পাচ্ছেন না। স্থানীয়দের অভিযোগ, শুধু বসতবাড়ি নয়, শিক্ষা ও প্রশাসনিক গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলোও আজ হুমকির মুখে। এর মধ্যে রয়েছে চর কড়াইবরিশাল নিম্নমাধ্যমিক বিদ্যালয়, একাধিক সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, ইউনিয়ন পরিষদ ভবন, ভূমি অফিস, স্থানীয় বাজার এবং নির্মাণাধীন বন্যা আশ্রয়কেন্দ্র। এসব প্রতিষ্ঠান নদীগর্ভে বিলীন হলে চরাঞ্চলের শিক্ষা ও প্রশাসনিক সেবা ব্যবস্থা পুরোপুরি ভেঙে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
স্থানীয় চিলমারী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আমিনুল ইসলাম জানিয়েছেন, পরিস্থিতি অত্যন্ত উদ্বেগজনক। দ্রুত ভাঙন রোধে স্থায়ী কোনো পদক্ষেপ না নিলে চরাঞ্চলের মানচিত্র বদলে যেতে পারে। এদিকে, কুড়িগ্রাম পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী রাকিবুল হাসান দাবি করেছেন যে, চরাঞ্চলে স্থায়ী নদীরক্ষা প্রকল্পের জন্য কোনো বরাদ্দ নেই। তবে জরুরি ভিত্তিতে দেড় হাজার জিও ব্যাগ বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে এবং তা ডাম্পিংয়ের কাজ চলছে। যদিও সরেজমিনে ভাঙনকবলিত এলাকায় জিও ব্যাগ ফেলার কোনো দৃশ্যমান তৎপরতা দেখা যায়নি বলে স্থানীয়রা অভিযোগ করেছেন।
বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের স্থানীয় প্রশাসন ক্ষতিগ্রস্তদের পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছে। চিলমারী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মাহমুদুল হাসান জানিয়েছেন, ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর মাঝে শুকনা খাবার ও সরকারি ত্রাণ হিসেবে চাল বিতরণ করা হয়েছে। এছাড়া নিরাপদ স্থানে বসতঘর সরিয়ে নিতে প্রশাসনের পক্ষ থেকে সব ধরনের সহযোগিতা প্রদানের আশ্বাস দেওয়া হয়েছে। তবে চরের মানুষগুলো চায় স্থায়ী সমাধান। বারবার ঘরবাড়ি হারানোর আতঙ্ক আর অনিশ্চিত ভবিষ্যতের হাতছানি থেকে মুক্তি পেতে তারা দীর্ঘমেয়াদী নদী শাসন ও টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণের দাবি জানিয়েছেন।
দেশনেত্র দৃষ্টি ছাড়িয়ে