মধ্যপ্রাচ্যের হরমুজ প্রণালিতে সৃষ্ট সাম্প্রতিক ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা বিশ্ব অর্থনীতিতে বড় ধরনের ধাক্কা দিলেও, এর বিপরীতে চীন নিজেকে সুবিধাজনক অবস্থানে রাখতে সক্ষম হয়েছে। আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনৈতিক পরামর্শক প্রতিষ্ঠান ‘দ্য এশিয়া গ্রুপ’-এর সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে যে, বিশ্বব্যাপী জ্বালানি ও পণ্য সরবরাহ ব্যবস্থায় যে বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়েছে, তা মোকাবিলায় চীন অন্যান্য দেশের তুলনায় অনেক বেশি প্রস্তত ছিল।
ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার উত্তজনা এবং হরমুজ প্রণালি কার্যত অকার্যকর হয়ে পড়ার ফলে এশিয়ার দেশগুলো জ্বালানি সংকটের মুখে পড়ে। উল্লেখ্য যে, এই পথ দিয়ে এশিয়ার মোট আমদানিকৃত তেলের প্রায় ৮০ শতাংশ এবং তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের ৯০ শতাংশ পরিবাহিত হতো। তবে চীন এই সংকট শুরুর অনেক আগে থেকেই কৌশলগত জ্বালানি মজুত গড়ে তোলার ওপর বিশেষ জোর দিয়েছিল। গত বছর আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম কমে যাওয়ার সুযোগ নিয়ে চীন তাদের মজুত উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি করে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি পর্যন্ত দেশটির কাছে যে পরিমাণ অপরিশোধিত তেলের মজুত ছিল, তা দিয়ে কোনো আমদানি ছাড়াই প্রায় ১০৪ দিন দেশটির চাহিদা মেটানো সম্ভব।
জ্বালানি নিরাপত্তার পাশাপাশি নবায়নযোগ্য শক্তির ক্ষেত্রে চীনের বিশাল বিনিয়োগ তাদের এই সংকটে বাড়তি সুরক্ষা দিয়েছে। বেইজিং গত এক বছরে ৩১৫ গিগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা যুক্ত করেছে, যা বিশ্বের মোট নতুন সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের অর্ধেকেরও বেশি। ২০৩০ সালের মধ্যে জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে অর্ধেক জ্বালানি নবায়নযোগ্য উৎস থেকে পাওয়ার লক্ষ্য নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে দেশটি। বর্তমানে চীনের নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা ১.৪ টেরাওয়াটে পৌঁছেছে, যা তাদের জ্বালানি খাতের ঝুঁকি কমাতে বড় ভূমিকা রাখছে।
অর্থনৈতিক সুরক্ষার পাশাপাশি চীন এই সংকটকে কূটনৈতিক সুযোগ হিসেবেও কাজে লাগাচ্ছে। বিশ্বমঞ্চে যুক্তরাষ্ট্রের নীতিগুলো কীভাবে বৈশ্বিক অস্থিতিশীলতা তৈরি করছে, তা তুলে ধরার মোক্ষম সুযোগ হিসেবে দেখছে বেইজিং। তবে বিশ্লেষকরা সতর্ক করে বলছেন, বিষয়টি কেবল চীনের লাভের হিসাব নয়, বরং এর পেছনে বড় ধরনের ঝুঁকিও রয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার মতো দায়িত্ব নিতে চীন এখনো আগ্রহী নয়। এছাড়া, হরমুজ প্রণালির মতো গুরুত্বপূর্ণ জলপথ বন্ধ হয়ে যাওয়ার ঘটনা থেকে চীন শিক্ষা নিচ্ছে, যা ভবিষ্যতে তাইওয়ান প্রণালির মতো স্পর্শকাতর অঞ্চলে সামরিক কৌশল নির্ধারণে তাদের আরও সতর্ক করবে। সব মিলিয়ে, চীন এই সংকটকে একটি হুমকি হিসেবে না দেখে বরং একটি চ্যালেঞ্জ হিসেবে গ্রহণ করে নিজেদের সক্ষমতা বাড়ানোর কাজে ব্যয় করছে।
দেশনেত্র দৃষ্টি ছাড়িয়ে