মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক মানচিত্র পুনর্গঠনের নেশায় মত্ত ইসরায়েল এখন তাদের সামরিক কৌশলের মোড় ঘোরাচ্ছে তুরস্কের দিকে। সম্প্রতি ইরানকে নিয়ে মার্কিন প্রশাসনের সাথে ইসরায়েলের দ্বিমুখী চুক্তির পর, তেল আবিব তাদের আগ্রাসী ‘কিল ফার্স্ট’ বা ‘প্রথমে হত্যা করো’ নীতি বাস্তবায়নে নতুন ক্ষেত্র খুঁজছে। বিশ্লেষকদের মতে, ইরানকে নিয়ে কৌশলগত জটিলতার পর ইসরায়েলি নীতিনির্ধারকরা এখন তুরস্ক, সিরিয়া ও কাতারকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা একটি নতুন ‘সুন্নি অক্ষ’কে নিজেদের অস্তিত্বের জন্য হুমকি হিসেবে দেখছে।
লেবাননের ভূখণ্ডে ইসরায়েলের সামরিক কর্মকাণ্ড এবং মার্কিন মধ্যস্থতায় স্বাক্ষরিত বিতর্কিত চুক্তিগুলো লেবাননের সার্বভৌমত্বকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। এই চুক্তির মাধ্যমে একদিকে লেবাননের সেনাবাহিনীকে হিজবুল্লাহর মতো অভিজ্ঞ গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে দাঁড় করানো হচ্ছে, অন্যদিকে ইসরায়েলি বাহিনীর যুদ্ধাপরাধকে দায়মুক্তি দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে। লেবাননের রাজনৈতিক অঙ্গনে এই ঘটনা গৃহযুদ্ধের আশঙ্কা তৈরি করেছে, যা নাবিহ বেরির মতো নেতাদের கடும் বিরোধিতার মুখে পড়েছে। ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এই পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে মধ্যপ্রাচ্যে নিজের আধিপত্য বজায় রাখতে মরিয়া হয়ে উঠেছেন।
ইসরায়েলি রাজনৈতিক মহলে এখন তুরস্ককে ‘নতুন ইরান’ হিসেবে আখ্যা দেওয়া হচ্ছে। নাফতালি বেনেট এবং আমিচাই চিকলির মতো নেতারা তুরস্কের ক্রমবর্ধমান প্রভাবকে ইসরায়েলের নিরাপত্তার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ বলে প্রচার করছেন। বাশার আল-আসাদের পতনের পর সিরিয়ার বিশাল অংশ দখল এবং সেখানে সামরিক উপস্থিতি বজায় রাখার মাধ্যমে ইসরায়েল মূলত তুরস্কের আঞ্চলিক প্রভাবকে খর্ব করার পরিকল্পনা করেছে। বিশেষ করে সাইপ্রাস ও পূর্ব ভূমধ্যসাগরে তুরস্কের নৌ-প্রভাব মোকাবিলায় ইসরায়েল গ্রিসের সাথে ঘনিষ্ঠতা বাড়াচ্ছে।
এতদিন তুরস্কের প্রতিক্রিয়া ছিল বেশ কৌশলী ও নমনীয়। কিন্তু ২০২৪ সালের স্থানীয় নির্বাচনের পর আঙ্কারা তাদের অবস্থান পরিবর্তন করেছে। এরদোয়ান প্রশাসন এখন বুঝতে পেরেছে যে ইসরায়েলের হুমকি কেবল রাজনৈতিক বাগাড়ম্বর নয়, বরং বাস্তব সামরিক ঝুঁকি। এর প্রতিক্রিয়ায় তুরস্ক তাদের নৌশক্তি বৃদ্ধি, ড্রোন প্রযুক্তির উন্নয়ন এবং নিজস্ব প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা শক্তিশালী করার দিকে নজর দিচ্ছে। এছাড়া সৌদি আরব ও পাকিস্তানের সাথে নতুন প্রতিরক্ষা জোট গঠনের উদ্যোগও ইসরায়েলকে বিচলিত করে তুলেছে। যদিও তুর্কি সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, ইসরায়েলের বিমানবাহিনীর সাথে পূর্ণাঙ্গ সংঘাত মোকাবিলায় তুরস্কের সক্ষমতা অর্জনে আরও তিন থেকে পাঁচ বছর সময় লাগতে পারে। দিনশেষে, মধ্যপ্রাচ্যে ইসরায়েলের সীমানা পরিবর্তনের এই উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনা পুরো অঞ্চলকে এক দীর্ঘমেয়াদী অস্থিরতার দিকে ঠেলে দিচ্ছে, যার পরিণতি মোকাবিলা করাই এখন আঙ্কারাসহ আঞ্চলিক শক্তিগুলোর সামনে প্রধান চ্যালেঞ্জ।
দেশনেত্র দৃষ্টি ছাড়িয়ে