৮ বছর বয়সী শিশু রামিসা ধর্ষণ ও হত্যা মামলার প্রধান অভিযুক্ত সোহেল রানা অভিযোগ গঠনের দিনে এক নতুন নাম প্রকাশ করেছেন। সোমবার (১ জুন ২০২৬) ঢাকার মহানগর শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে অভিযোগ গঠনের শুনানিতে তাকে আদালতে তোলার সময় সাংবাদিকদের কাছে তিনি দাবি করেন, এই জঘন্য অপরাধে ‘ডলার’ নামের এক ব্যক্তিও জড়িত। এই নতুন তথ্য মামলার তদন্ত ও বিচার প্রক্রিয়ায় নতুন মাত্রা যোগ করেছে এবং জনমনে কৌতূহল সৃষ্টি করেছে। ট্রাইব্যুনাল এই মামলার বিচার শুরুর জন্য মঙ্গলবার (২ জুন ২০২৬) তারিখ ধার্য করেছেন।
আদালতে প্রবেশের সময় সোহেল রানা সাংবাদিকদের বলেন, “আমি দোষী, তবে ডলারও দোষী। আমি একা দোষী নই।” পরে এজলাসে দাঁড়িয়ে আইনজীবীদের উদ্দেশে চিৎকার করে তিনি আরও দাবি করেন, “আমি ধর্ষণ করিনি; আমি শুধু দেহ খণ্ড-বিখণ্ড করেছি। ডলার নামের একজন ধর্ষণ করেছে। আমি পাপ করেছি, তাই সেই পাপের জন্য আমাকে শাস্তি দিন।” সোহেলের এই দাবি তার পূর্বে দেওয়া স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দির সঙ্গে সাংঘর্ষিক, যেখানে তিনি একাই অপরাধের দায় স্বীকার করেছিলেন বলে জানা যায়। তিনি আরও বলেন, ডলার তাকে রামিসাকে তার কাছে নিয়ে আসার জন্য ২ লাখ টাকা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। তবে উপস্থিত পুলিশ সদস্যরা তাকে দ্রুত কথা বলা থেকে বিরত রাখেন। সোহেল তার স্ত্রী স্বপ্না খাতুনকে নির্দোষ বলেও দাবি করেন।
সোমবার ঢাকার মহানগর দায়রা জজ আদালতের হাজতখানায় সোহেল ও স্বপ্নাকে আনা হয়। পরে মহানগর শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক মাসরুর সালেকিন পল্লবী এলাকায় রামিসাকে ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনায় তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করেন। অভিযোগ পড়ে শোনানো হলে উভয় অভিযুক্ত নিজেদের নির্দোষ দাবি করেন বলে বেঞ্চ সহকারী পঙ্কজ পিটার গোমেজ জানান। বিচারক মঙ্গলবার থেকে সাক্ষ্যগ্রহণ শুরুর নির্দেশ দেন এবং মামলার বাদী ও নিহত রামিসার বাবা আব্দুল হান্নান মোল্লাকে প্রথম সাক্ষী হিসেবে আদালতে হাজির হওয়ার কথা রয়েছে।
উল্লেখ্য, গত ১৯ মে ঢাকার পল্লবী এলাকার বাসিন্দা এবং পপুলার মডেল হাই স্কুলের দ্বিতীয় শ্রেণির ছাত্রী রামিসাকে প্রতিবেশী সোহেলের বাড়িতে মাথা বিচ্ছিন্ন অবস্থায় মৃত অবস্থায় পাওয়া যায়। এই লোমহর্ষক ঘটনা সারাদেশে চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করে। প্রাথমিক তদন্তে জানা যায়, সোহেল রামিসাকে প্রলুব্ধ করে তার ঘরে নিয়ে ধর্ষণ করে। এরপর অপরাধ ঢাকতে সে রামিসার গলা কেটে দেহ খণ্ড-বিখণ্ড করার চেষ্টা করে।
ঘটনার পরদিন ২০ মে রামিসার বাবা পল্লবী থানায় সোহেল, তার স্ত্রী স্বপ্না এবং একজন অজ্ঞাতনামা ব্যক্তির বিরুদ্ধে একটি মামলা দায়ের করেন। একই দিনে পুলিশ সোহেল ও স্বপ্নাকে আদালতে হাজির করে এবং আদালত সূত্রে জানা যায়, সোহেল ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিতে সম্মত হন। পল্লবী থানার উপ-পরিদর্শক ওহিদুলজ্জামান সে সময় জানিয়েছিলেন, প্রধান অভিযুক্ত প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে অপরাধ স্বীকার করেছেন। গত ২৪ মে উপ-পরিদর্শক ওহিদুলজ্জামান ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে সোহেলের বিরুদ্ধে ধর্ষণ, হত্যা এবং আলামত নষ্টের অভিযোগ এবং স্বপ্নার বিরুদ্ধে আলামত নষ্ট ও মিথ্যা তথ্য প্রদানের অভিযোগ এনে অভিযোগপত্র জমা দেন। কয়েক ঘণ্টা পর সিএমএম আদালত মামলাটি বিচারের জন্য শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে প্রেরণ করেন।
মামলার গুরুত্ব বিবেচনা করে গত ২২ মে ঢাকা আইনজীবী সমিতি এক জরুরি ভার্চুয়াল সভার পর অভিযুক্তদের কোনো আইনি সহায়তা না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। তবে একটি সুষ্ঠু বিচার নিশ্চিত করার লক্ষ্যে, পরের দিন ২৩ মে সরকার সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মুসা কালিমুল্লাহকে অভিযুক্তদের পক্ষে রাষ্ট্রীয় প্রতিরক্ষা আইনজীবী হিসেবে নিয়োগ দেয়। এই পদক্ষেপ আইনি প্রক্রিয়ার নিরপেক্ষতা বজায় রাখার গুরুত্ব তুলে ধরে।
সোহেলের মুখে ‘ডলার’ নামের নতুন ব্যক্তির জড়িত থাকার দাবি মামলার গতিপথ পরিবর্তন করতে পারে। এখন প্রশ্ন উঠেছে, পুলিশ কি এই ‘ডলার’ নামের ব্যক্তিকে শনাক্ত ও গ্রেপ্তার করার জন্য নতুন করে তদন্ত শুরু করবে? যদি ‘ডলার’ নামের কোনো ব্যক্তির অস্তিত্ব প্রমাণিত হয়, তবে তা মামলার চূড়ান্ত রায়ে কী প্রভাব ফেলবে তা সময়ই বলে দেবে। তবে, বিচারিক প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার ঠিক আগে প্রধান অভিযুক্তের এমন দাবি নিঃসন্দেহে জনমনে নতুন করে কৌতূহল ও প্রশ্ন তৈরি করেছে।
দেশনেত্র দৃষ্টি ছাড়িয়ে