কানসাস সিটিতে অনুষ্ঠিত এক তীব্র ফুটবল ম্যাচে সুইজারল্যান্ডের ফরোয়ার্ড ব্রিল এমবোলোর বিতর্কিত লাল কার্ড প্রাপ্তি ফুটবল বিশ্বে আলোচনার ঝড় তুলেছে। ম্যাচের ৭২তম মিনিটে পর্তুগিজ রেফারি জোয়াও পিনেইরোর এই সিদ্ধান্ত শুধু এমবোলোকেই মাঠ ছাড়তে বাধ্য করেনি, একইসঙ্গে সুইজারল্যান্ডের সেমিফাইনালে ওঠার স্বপ্নও অনেকটা ফিকে করে দিয়েছে। এই ঘটনাটি আধুনিক ফুটবলে ভিডিও অ্যাসিস্ট্যান্ট রেফারি (ভিএআর) ব্যবস্থার প্রয়োগ এবং ফিফার নতুন নিয়মের কার্যকারিতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে।
ঘটনার সূত্রপাত হয়েছিল ম্যাচের ৭২তম মিনিটে, যখন আর্জেন্টিনা ও সুইজারল্যান্ড ১-১ গোলে সমতায় ছিল। আর্জেন্টিনার লিয়ান্দ্রো পারেদেসের চ্যালেঞ্জের পর এমবোলো মাঠে পড়ে গেলে রেফারি প্রাথমিকভাবে পারেদেসকে হলুদ কার্ড দেখান। মাঠের রেফারি মনে করেছিলেন যে পারেদেস ফাউল করেছেন। কিন্তু ভিএআর-এর হস্তক্ষেপ পুরো পরিস্থিতি পাল্টে দেয়। বেশ কয়েকটি ভিডিও রিপ্লে পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে পর্যালোচনা করার পর ভিএআর দল রেফারিকে জানায় যে পারেদেস আসলে এমবোলোকে কোনো ফাউল করেননি। বরং, সুইস ফরোয়ার্ড নিজেই ডাইভ দিয়ে রেফারিকে প্রতারিত করার চেষ্টা করেছিলেন, যাকে ফুটবলের পরিভাষায় ‘সিমুলেশন’ বলা হয়।
ভিএআর-এর সুপারিশের ভিত্তিতে রেফারি পিনেইরো তার প্রাথমিক সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করেন। পারেদেসের হলুদ কার্ড বাতিল করা হয় এবং ডাইভ দেওয়ার অপরাধে এমবোলোকে হলুদ কার্ড দেখানো হয়। যেহেতু এমবোলোর নামের পাশে ম্যাচের শুরুতেই একটি হলুদ কার্ড ছিল, দ্বিতীয় হলুদ কার্ড প্রাপ্তির ফলে তিনি স্বয়ংক্রিয়ভাবে লাল কার্ড দেখে মাঠ ছাড়তে বাধ্য হন। এই সিদ্ধান্তটি ফিফার নতুন ‘ভুল খেলোয়াড় শনাক্তকরণ’ (Mistaken Identity) নিয়মের আওতায় পড়ে, যা চলতি বিশ্বকাপেই চালু হয়েছে। এই নিয়ম ভিএআর-কে এমন ক্ষেত্রে হস্তক্ষেপ করার ক্ষমতা দিয়েছে যেখানে রেফারি কোনো অপরাধের জন্য ভুল খেলোয়াড়কে শাস্তি দেন।
ফুটবলের আইন প্রণয়নকারী সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন বোর্ড (আইএফএবি) ‘ভুল খেলোয়াড় শনাক্তকরণ’ পরিস্থিতিকে ‘ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দেওয়া’ ভুল হিসেবে আখ্যায়িত করেছে। আইএফএবির ব্যাখ্যা অনুযায়ী, এটি এমন একটি পরিস্থিতি যখন রেফারি কোনো অপরাধের জন্য হলুদ বা লাল কার্ড দেখান, কিন্তু ভুলবশত দুই দলের ভিন্ন বা ভুল কোনো খেলোয়াড়কে শাস্তি দিয়ে বসেন। এই নতুন নিয়মটি ফিফার রেফারিদের প্রধান পিয়েরলুইজি কোলিনার বিশেষ অনুরোধে চালু করা হয়েছে, যাতে রেফারির মূল সিদ্ধান্ত যদি স্পষ্ট ভুলের কারণে ভুল খেলোয়াড়কে লক্ষ্য করে থাকে, তবে ভিএআর তা সংশোধন করার সুযোগ পায়। যদি পারেদেসকে প্রাথমিকভাবে হলুদ কার্ড না দেখানো হতো, তবে এই ‘ভুল খেলোয়াড় শনাক্তকরণ’ নিয়মটি প্রয়োগ করা যেত না এবং এমবোলোও সে যাত্রায় বেঁচে যেতেন।
ক্রীড়াভিত্তিক সংবাদমাধ্যম ইএসপিএন এই ঘটনাটি বিশ্লেষণ করেছে, যেখানে সাবেক সিলেক্ট গ্রুপ রেফারি অ্যান্ডি ডেভিস এমবোলোর লাল কার্ডের যৌক্তিকতা তুলে ধরেছেন। ডেভিসের মতে, এমবোলো এই ঘটনার জন্য কেবল নিজেকেই দোষ দিতে পারেন, কারণ তিনি আর্জেন্টিনার খেলোয়াড়কে কার্ড দেখানোর উদ্দেশ্যে রেফারিকে প্রতারিত করার চেষ্টা করেছিলেন। এটিই প্রথমবার নয় যে এমন ‘ভুল খেলোয়াড় শনাক্তকরণ’ ঘটনা ঘটেছে; এর আগে যুক্তরাষ্ট্র বনাম প্যারাগুয়ে ম্যাচে মিগুয়েল আলমিরনও হলুদ কার্ড দেখেছিলেন। তবে, এই নিয়মের কারণে মাঠ ছাড়তে হওয়া প্রথম খেলোয়াড় হলেন ব্রিল এমবোলো।
এমবোলোর লাল কার্ড দেখার পর সুইজারল্যান্ডের খেলোয়াড়রা মাঠে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখান এবং সিদ্ধান্তটি মেনে নিতে পারেননি। দলের কোচ মুরাত ইয়াকিন এই সিদ্ধান্তের তীব্র সমালোচনা করে বলেন, “হলুদ কার্ড দেখানোর মতো কোনো কারণই ছিল না। এটি ছিল খুবই সাধারণ এক পরিস্থিতি। রেফারির উচিত ছিল খেলা চালিয়ে যেতে দেওয়া।” ইয়াকিন আরও যোগ করেন যে, “এমন একটি নিয়মের কারণে আমাদের শাস্তি পেতে হলো যা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। তাদের অহেতুক হস্তক্ষেপ আমাদের ভীষণভাবে আঘাত করেছে। এই নিয়মের সঙ্গে ফুটবলের কোনো সম্পর্কই নেই।” এমবোলোর বহিষ্কারের ফলে সুইজারল্যান্ড ১০ জনের দলে পরিণত হয়। এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে আর্জেন্টিনা অতিরিক্ত সময়ে দুটি গোল করে এবং ৩-১ গোলের জয়ে সেমিফাইনালে নিজেদের স্থান নিশ্চিত করে। ইয়াকিন ক্ষোভের সঙ্গে বলেন, “এটি আমাদের পুরো ম্যাচই শেষ করে দিয়েছে। এভাবে হেরে যাওয়াটা ভীষণ কষ্টদায়ক।”
এই ঘটনাটি ভিএআর প্রযুক্তির প্রয়োগ এবং ফুটবলের নিয়মের ব্যাখ্যা নিয়ে নতুন করে বিতর্ক সৃষ্টি করেছে। ফিফা এই নিয়মের বিষয়ে ভবিষ্যতে কোনো স্পষ্ট ব্যাখ্যা দেয় কিনা এবং রেফারিদের ভবিষ্যৎ ম্যাচগুলোতেও একই ব্যাখ্যা মেনে চলার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে কিনা, তা দেখার বিষয়। কারণ, এই নিয়ম ভিএআরকে এমন কিছু ক্ষেত্রে হস্তক্ষেপ করার সুযোগ করে দিচ্ছে, যা আগে তাদের এখতিয়ারে ছিল না। এমবোলোর কান্নারত অবস্থায় মাঠ ছাড়ার দৃশ্য এবং তার দলের স্বপ্নভঙ্গের ঘটনাটি ফুটবল ইতিহাসের পাতায় একটি বিতর্কিত অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে, যা ভিএআর প্রযুক্তির সুবিধা ও অসুবিধা উভয়কেই পুনরায় আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে এসেছে।
দেশনেত্র দৃষ্টি ছাড়িয়ে