কক্সবাজারের চকরিয়া পৌরসভার কোচপাড়া এলাকায় মাতামুহুরী নদীর ভয়াবহ ভাঙনে দিশেহারা হয়ে পড়েছে স্থানীয় বাসিন্দারা। অতিবৃষ্টি ও উজানের ঢলে নদীর পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় একের পর এক বসতভিটা নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যাচ্ছে। নিজেদের শেষ সম্বলটুকু হারিয়ে খোলা আকাশের নিচে আশ্রয় নিতে বাধ্য হচ্ছেন শত শত পরিবার, যাদের ভবিষ্যৎ এখন অনিশ্চয়তায় ঘেরা।
কফিল উদ্দিন (৪৫) নামের এক বাসিন্দা তার ছয় সদস্যের পরিবার নিয়ে চরম সংকটে পড়েছেন। চোখের সামনেই তার একমাত্র বসতঘরটি নদীতে হেলে পড়েছে, যা আর বসবাসের অযোগ্য। শনিবার বিকেলে জীবিকার তাগিদে ট্রলি নিয়ে বের হওয়ার পর ভাঙনের তীব্রতার খবর পেয়ে তিনি দ্রুত নদীর পাড়ে ফিরে আসেন। নিজের বিলীনপ্রায় ঘরের দিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলে তিনি জানান, বহু কষ্টে জমানো টাকায় তিনি এই ঘর তৈরি করেছিলেন, যেখানে তার স্ত্রী ও চার সন্তান নিয়ে বসবাস করতেন। এখন সেই ঘর নদী কেড়ে নিচ্ছে, আর তাদের আশ্রয় নেওয়ার মতো কোনো জায়গা নেই।
শুধু কফিল উদ্দিনই নন, এই এলাকার আরও অন্তত ১২টি পরিবারের বসতঘর সম্পূর্ণভাবে নদীগর্ভে চলে গেছে। এছাড়া প্রায় ২৫টি বাড়ির উঠান ও সংলগ্ন এলাকা নদীভাঙনের শিকার হয়েছে, যেখানে বড় বড় ফাটল দেখা দিয়েছে, ইট খুলে পড়েছে এবং মেঝে দেবে যাচ্ছে। বৃষ্টি কিছুটা কমার পর নদীর পানি কমলেও ক্ষয়ক্ষতির চিত্র আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। ভাঙনের ঝুঁকিতে থাকা পরিবারগুলো তাদের আসবাবপত্র পাকা সড়কের পাশে পলিথিন দিয়ে ঢেকে রেখেছে এবং অনেকেই সড়কের পাশেই রাত কাটাচ্ছেন।
কফিল উদ্দিনের স্ত্রী জাহানারা বেগম কান্নায় ভেঙে পড়ে জানান, ২০২০ সালের করোনা মহামারির সময়ে অনেক কষ্ট করে স্বামী-স্ত্রী মিলে এই ঘরটি তৈরি করেছিলেন। ২০২৩ সালের বন্যায় ঘরের একটি কক্ষ নদীতে ধসে গিয়েছিল, আর এবারের বন্যায় পুরো ঘরটিই নদী টেনে নিয়ে যাচ্ছে। তাদের মতো আরও অনেক পরিবার একই ধরনের সংকটের সম্মুখীন।
মিনহাজ উদ্দিন, যিনি একজন দিনমজুর, তার পরিবারেও একই চিত্র। তার বসতঘরের দরজায় এসে পৌঁছেছে নদীভাঙন। মিনহাজ উদ্দিনের স্ত্রী শাহিন আক্তার ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, প্রায় ১০-১৫ দিন আগে পানি উন্নয়ন বোর্ড কিছু বালুর বস্তা ফেললেও সেগুলো বসতবাড়ির কিনারায় না ফেলে নদীর মাঝখানে ফেলা হয়েছে, যা ভাঙন রোধে কোনো কাজে আসেনি। তিনি কক্সবাজারের মেরিন ড্রাইভের মতো কার্যকর এবং স্থায়ী সমাধান দাবি করেন।
ফাতেমা বেগম (৪৫) নামের আরেক প্রবীণ বাসিন্দা জানান, ২৭ বছর আগে তার বিয়ের পর তিনি এই এলাকায় আসেন। তখন মাতামুহুরী নদী বর্তমান অবস্থান থেকে প্রায় ২৫০ ফুট দূরে ছিল। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে নদীর গতিপথ পরিবর্তিত হয়ে পশ্চিম পাড় ভাঙতে ভাঙতে এখন লোকালয়ে ঢুকে পড়েছে। এই দীর্ঘমেয়াদী ভাঙন প্রক্রিয়া এখন জনবসতির জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
স্থানীয় কাউন্সিলর মুজিবুল হক বলেন, গত ১০ থেকে ১৫ বছরে সংসদ সদস্য, জেলা প্রশাসক এবং পানি উন্নয়ন বোর্ডের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা একাধিকবার এলাকা পরিদর্শন করেছেন। কিন্তু দুঃখজনকভাবে, ভাঙন রোধে কোনো স্থায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। এর ফলে প্রতি বর্ষা মৌসুমে প্রায় ৩৫ থেকে ৪০টি পরিবার নদীভাঙনের আতঙ্কে দিন কাটায়। তিনি দ্রুত এবং কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানান।
কক্সবাজার পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. নূরুল ইসলাম প্রথম আলোকে জানিয়েছেন, ভাঙন রোধে একটি প্রকল্প প্রস্তুত করা হচ্ছে। তিনি স্বীকার করেন যে, সেখানে কংক্রিটের ব্লক দেওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় ঢাল নেই, তবে কংক্রিটের ব্লক বসানোর বিষয়টি তাদের পরিকল্পনায় রয়েছে। এই প্রকল্প দ্রুত বাস্তবায়ন হলে হয়তো চকরিয়ার কোচপাড়ার বাসিন্দারা কিছুটা স্বস্তি পাবে, তবে তার আগ পর্যন্ত এই অনিশ্চয়তা তাদের নিত্যসঙ্গী।
দেশনেত্র দৃষ্টি ছাড়িয়ে