ভারী বর্ষায়ও থামে না জীবিকার সংগ্রাম: ফুড ডেলিভারি কর্মীদের অদম্য পথচলা

ভারী বৃষ্টিতে যখন রাজধানী ঢাকার জনজীবন স্থবির হয়ে পড়ে, অনেক মানুষ ঘরে আশ্রয় নেন, তখনও থেমে থাকে না জীবিকার সংগ্রাম। প্রতিকূল আবহাওয়ার মাঝেও জীবন ও জীবিকার তাগিদে পথে নামেন শত শত মানুষ, যাদের মধ্যে অন্যতম হলেন ফুড ডেলিভারি কর্মীরা। এমনই একজন ২০ বছর বয়সী তরুণ শেখ হাসান, যিনি ঘোর বর্ষায় হাঁটু পানি ভেঙে সাইকেল চালিয়ে মোহাম্মদপুরের অলিগলিতে খাবার পৌঁছে দেন। তার পিঠে খাবারের ব্যাগ, মাথার উপর অবিরাম ধারাপাত—তবুও তার চোখেমুখে ক্লান্তি নয়, বরং বাড়তি আয়ের সুযোগের এক অদম্য স্পৃহা।

রবিবার সকালে রাজধানীর মোহাম্মদীয়া হাউজিংয়ে শেখ হাসানের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, সেদিন একটি বিশেষ অফার চলছিল। সকাল ১১টা ৪৫ মিনিট থেকে দুপুর ১টা ৪৫ মিনিট পর্যন্ত দুই ঘণ্টার এই কুইজ অফারে প্রতিটি ডেলিভারির জন্য স্বাভাবিকের চেয়ে ১৫ টাকা বেশি পাওয়া যাচ্ছিল। হাসান জানান, সাধারণত একটি ডেলিভারির জন্য ২২ থেকে ৩০ টাকা আয় হয়। তবে রাতের বেলা এই পরিমাণ ৪০ টাকা পর্যন্তও পৌঁছায়। গোপালগঞ্জের এই তরুণ প্রতিদিন প্রায় ১০০০ টাকার কাজ করেন, যার জন্য তাকে ৩০টির মতো ডেলিভারি সম্পন্ন করতে হয় এবং ১০ ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে পরিশ্রম করতে হয়। এই বিশেষ অফারটি তার কাছে বাড়তি প্রণোদনা হলেও, এমন অফার না থাকলেও জীবিকার প্রয়োজনে তাকে বেরোতেই হতো। মাঝেমধ্যে বৃষ্টিতে কোম্পানি এমন বিশেষ অফার দেয়, যা কর্মীদের জন্য কিছুটা স্বস্তি নিয়ে আসে।

আজকের দুই ঘণ্টার অফারে হাসান চারটি ডেলিভারি দিতে সক্ষম হন, যা থেকে তার বাড়তি ৬০ টাকা আয় হয়েছে। এই সামান্য বাড়তি আয়েও তার মুখে হাসি ফোটে। তবে তিনি আক্ষেপ করে জানান, সব সময় বৃষ্টির মধ্যে এমন অফার পাওয়া যায় না। তার মতো অসংখ্য তরুণ-যুবক সেদিন সকালে ভারী বৃষ্টির মধ্যে খাবারের ব্যাগ নিয়ে রাস্তায় ছুটে চলেছেন। তাদের কাজের ধরন এমন যে, ডেলিভারিতে দেরি হলে কোম্পানির রেটিং কমে যায়, যার সরাসরি প্রভাব পড়ে তাদের আয়ের ওপর। তাই হাসানদের হাতে সময় খুব কম থাকে, সামান্য কথা বলার ফাঁকেই তার ব্যাগে মোহাম্মদপুরের ‘হোমমেড ফুড ক্যানটিন’ থেকে খাবার ভরে ওঠে, আরও কয়েকটি ডেলিভারির উদ্দেশ্যে তাকে দ্রুত ছুটতে হয়। বৃষ্টি থামুক বা না থামুক, তার প্রতিদিনের আয় প্রতিটি অর্ডারের ওপর নির্ভরশীল।

ফুড ডেলিভারি প্ল্যাটফর্মগুলো দেশের শহরাঞ্চলে এক বিরাট কর্মসংস্থান তৈরি করেছে, বিশেষ করে তরুণদের জন্য। এটি তথাকথিত ‘গিগ ইকোনমি’-র একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ, যেখানে কর্মীরা নির্দিষ্ট কোনো প্রতিষ্ঠানের বেতনভুক্ত কর্মচারী না হয়ে চুক্তিভিত্তিক বা কাজভিত্তিক পারিশ্রমিক পান। এই কাজের সুবিধা হলো এর নমনীয়তা, যেখানে কর্মীরা নিজেদের সুবিধা অনুযায়ী কাজের সময় বেছে নিতে পারেন। তবে এর চ্যালেঞ্জগুলোও কম নয়। দীর্ঘ কর্মঘণ্টা, প্রতিকূল আবহাওয়ার সাথে লড়াই, ট্র্যাফিকের চাপ, এবং রেটিং ধরে রাখার নিরন্তর প্রতিযোগিতা তাদের নিত্যসঙ্গী। অনেক সময় তাদের কোনো সামাজিক সুরক্ষা বা স্বাস্থ্য বীমাও থাকে না, যা তাদের জীবনকে আরও ঝুঁকিপূর্ণ করে তোলে।

গত রাত থেকে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টিপাত হওয়ায় জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছিল। এমন পরিস্থিতিতে যারা ঘর থেকে বের হতে পারেননি, তাদের অনেকেই অনলাইনে খাবারের অর্ডার দিয়েছেন। ফলে, যারা খাদ্য সরবরাহ করেন, তাদের কাজের চাপ ও চাহিদা দুটোই বেড়ে যায়। এই পরিস্থিতিতে, শেখ হাসানের মতো ডেলিভারি কর্মীরা শুধু খাবার পৌঁছে দেন না, বরং তারা শহুরে জীবনযাত্রার এক অপরিহার্য অংশ হয়ে ওঠেন, যারা নিজেদের পরিশ্রম ও ত্যাগের মাধ্যমে সমাজের এক বিশাল অংশের প্রয়োজন মেটান। তাদের এই নিরলস সংগ্রাম কেবল ব্যক্তিগত জীবিকার তাগিদেই নয়, বরং এটি আধুনিক শহুরে অর্থনীতির এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। তাদের এই পরিশ্রমের গল্প, প্রতিকূলতার মাঝেও হার না মানার এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করে।

এছাড়াও

হিসাব মহানিয়ন্ত্রকের কার্যালয়ে ২৫৫টি অফিস সহায়ক পদের মৌখিক পরীক্ষা শুরু ৯ আগস্ট ২০২৬: বিস্তারিত নির্দেশনা

দেশের আর্থিক ব্যবস্থাপনার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান হিসাব মহানিয়ন্ত্রকের কার্যালয়ে (সিজিএ) অফিস সহায়ক পদের মৌখিক পরীক্ষা …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *