সিলেটের ঐতিহ্যবাহী হযরত শাহজালাল (রহ.)-এর মাজারে ভক্তদের দান করা অর্থ ও মূল্যবান সামগ্রী গণনা করে বিপুল পরিমাণ সম্পদ পাওয়া গেছে। জেলা প্রশাসনের তত্ত্বাবধানে টানা সাত ঘণ্টা ধরে এই গণনা কার্যক্রম পরিচালিত হয়, যেখানে প্রায় অর্ধকোটি টাকার বেশি বাংলাদেশি মুদ্রাসহ বিভিন্ন দেশের বৈদেশিক মুদ্রা এবং স্বর্ণালংকার উদ্ধার করা হয়েছে। এই প্রক্রিয়া মাজারের আর্থিক ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার একটি চলমান প্রচেষ্টার অংশ।
গত শনিবার (তারিখ উল্লেখ করে) বেলা সোয়া ১১টার দিকে মাজারের সিলগালা করা তিনটি ঐতিহাসিক ডেগ এবং সম্প্রতি স্থাপিত নতুন দানবাক্স খোলা হয়। ১৯ দিন পর দ্বিতীয়বারের মতো এই গণনা কার্যক্রম শুরু হয়ে সন্ধ্যা সোয়া ৬টা পর্যন্ত চলে। মাজার প্রাঙ্গণেই এই দীর্ঘ গণনা সম্পন্ন হয়, যেখানে জেলা প্রশাসন ও মাজারের আর্থিক ব্যবস্থাপনা কমিটির সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন।
সিলেট সিটি করপোরেশনের প্রশাসক এবং মাজারের আর্থিক ব্যবস্থাপনা ও সার্বিক পরিচালনায় স্বচ্ছতা আনতে গঠিত কমিটির সদস্য আবদুল কাইয়ুম চৌধুরী গণমাধ্যমকর্মীদের জানান, এবারের গণনায় মোট ৪৭ লাখ ১০ হাজার ১৫৩ টাকা পাওয়া গেছে। বাংলাদেশি মুদ্রার পাশাপাশি ভক্তরা বিভিন্ন দেশের বৈদেশিক মুদ্রাও দান করেছেন। এর মধ্যে রয়েছে ১৩৫ সৌদি রিয়াল, ২০ মার্কিন ডলার, ২ হাজার ৫৩২ ভারতীয় রুপি, ২২ কাতারি দিরহাম, ৬ মালয়েশীয় রিঙ্গিত, ২০ ইউরো, ওমানের ১ দশমিক ৪০ দিনার, সংযুক্ত আরব আমিরাতের ৫৪ দশমিক ২০ দিরহাম, ৪ হাজার ইন্দোনেশীয় রুপিয়া, ৬০ পাকিস্তানি রুপি এবং ১০ সিঙ্গাপুরি ডলার।
নগদ অর্থ ছাড়াও ভক্তদের দান করা মূল্যবান সামগ্রীর মধ্যে ছিল ৯ গ্রাম স্বর্ণালংকার, স্বর্ণালংকারসদৃশ ১০ গ্রাম বস্তু এবং ৩৯ দশমিক ৪ গ্রাম রুপা। এই ধরনের বহুমুখী দান হযরত শাহজালাল (রহ.)-এর প্রতি ভক্তদের গভীর শ্রদ্ধা ও বিশ্বাসের প্রতিফলন।
অর্থের পাশাপাশি ভক্তরা একটি গরু এবং ৬৫টি ছাগলও দান করেছেন। এর মধ্যে গরু এবং ৪০টি ছাগল তাৎক্ষণিকভাবে রান্না করে ভক্ত ও দরিদ্রদের মধ্যে বিতরণ করা হয়েছে। অবশিষ্ট ২৫টি ছাগল বিক্রি করে ১ লাখ ১৫ হাজার ৪০৭ টাকা আয় হয়েছে, যা মাজারের তহবিলে জমা করা হবে। এই দানকৃত পশুগুলো মাজারের দাতব্য কার্যক্রমের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
মাজারের আর্থিক ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে গঠিত কমিটির তত্ত্বাবধানে এই কার্যক্রম পরিচালিত হয়। আবদুল কাইয়ুম চৌধুরী ছাড়াও সিলেট নগর উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান রেজাউল হাসান কয়েস লোদী এবং সিলেটের ভারপ্রাপ্ত জেলা প্রশাসক পিংকি সাহাসহ সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা এ সময় উপস্থিত ছিলেন। মাজারের বিপুল পরিমাণ দান সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার জন্য এই ধরনের কমিটি ও স্বচ্ছ প্রক্রিয়া অত্যন্ত জরুরি।
উল্লেখ্য, এর আগে গত ২২ জুন মাজারের আটটি ডেগ ও দানবাক্স খোলা হয়েছিল, যেখানে মোট ১৭ লাখ ৫৪৯ টাকা নগদ পাওয়া যায়। সে সময় ৭ আনা স্বর্ণালংকার এবং সৌদি ৫ রিয়ালের দুটি নোটও মিলেছিল। সেই দানগুলো ছিল চার দিনের সংগৃহীত। এবারের সংগৃহীত অর্থও জেলা প্রশাসকের ব্যবস্থাপনায় একটি নতুন ব্যাংক হিসাবে জমা করা হবে, যেমনটি আগের বারের অর্থ জমা করা হয়েছিল। এই ধারাবাহিকতা মাজারের আর্থিক ব্যবস্থাপনার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক, যা ভক্তদের আস্থা বজায় রাখতে সাহায্য করে। হযরত শাহজালাল (রহ.)-এর মাজার বাংলাদেশের অন্যতম পবিত্র স্থান এবং প্রতি বছর দেশ-বিদেশ থেকে অসংখ্য ভক্ত ও দর্শনার্থী এখানে আসেন। ভক্তদের এই স্বতঃস্ফূর্ত দান মাজারের রক্ষণাবেক্ষণ, উন্নয়নমূলক কাজ এবং বিভিন্ন দাতব্য কার্যক্রমে ব্যবহৃত হয়।
দেশনেত্র দৃষ্টি ছাড়িয়ে