বাংলাদেশের বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অধীনে পররাষ্ট্র ও প্রতিরক্ষা নীতিতে নতুন মাত্রা যোগ করার লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছে ঢাকা ও বেইজিং। সম্প্রতি বাংলাদেশে নিযুক্ত চীনের রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন বিভিন্ন কূটনৈতিক আলাপচারিতায় দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের গভীরতা বৃদ্ধির ওপর জোর দিয়েছেন। বেইজিংয়ের পক্ষ থেকে স্পষ্ট করা হয়েছে যে, তারা বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা ও কূটনৈতিক কৌশলকে বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতার আলোকে ঢেলে সাজাতে আগ্রহী। বিশেষ করে অবকাঠামোগত উন্নয়ন এবং কৌশলগত অংশীদারিত্বের ক্ষেত্রে চীন নিজেদের অবস্থান আরও সুসংহত করতে চায়।
চীনের এই ক্রমবর্ধমান আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে তিস্তা মহাপরিকল্পনা। এই প্রকল্পে চীনের সম্পৃক্ততা নিয়ে ভারতের নিরাপত্তা বিশ্লেষক ও নীতিনির্ধারকদের মধ্যে এক ধরনের উদ্বেগ লক্ষ্য করা যাচ্ছে। ভৌগোলিক অবস্থানের দিক থেকে তিস্তা অববাহিকা ভারতের শিলিগুড়ি করিডর বা ‘চিকেনস নেক’-এর অতি সন্নিকটে হওয়ায়, চীনের এই বিনিয়োগকে ভারত তাদের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখছে। বেইজিংয়ের এই সম্পৃক্ততা শুধু অর্থনৈতিক নয়, বরং কৌশলগত প্রভাব বিস্তারের একটি অংশ বলে ধারণা করছেন আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞরা।
এর পাশাপাশি, দীর্ঘদিনের আলোচিত বাংলাদেশ-চীন-মিয়ানমার (বিসিআইএম) অর্থনৈতিক করিডর নিয়েও চীন তাদের দৃঢ় অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করেছে। রাষ্ট্রদূতের ভাষ্যমতে, এই করিডর বাস্তবায়িত হলে আঞ্চলিক বাণিজ্যে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন আসবে এবং বাংলাদেশের অর্থনীতিতে চীনের বিনিয়োগের নতুন দ্বার উন্মোচিত হবে। তবে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে এই প্রস্তাবগুলো পর্যালোচনা করছে। ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন বর্তমান প্রশাসন দেশের জাতীয় স্বার্থ এবং সার্বভৌমত্বকে অগ্রাধিকার দিয়ে বন্ধুপ্রতিম রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখার নীতি অনুসরণ করছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ঢাকা এখন কোনো একটি নির্দিষ্ট শক্তির ওপর নির্ভরশীল না হয়ে আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক শক্তিগুলোর সঙ্গে একটি নিরপেক্ষ ও ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতি বজায় রাখার চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। চীনের সঙ্গে প্রতিরক্ষা ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা বৃদ্ধির পাশাপাশি ভারতসহ অন্যান্য প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে আস্থার সম্পর্ক বজায় রাখা অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের জন্য এখন বড় কূটনৈতিক পরীক্ষা। বেইজিংয়ের এই কৌশলগত বিন্যাসের প্রস্তাবগুলো বাংলাদেশের উন্নয়ন আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ, তা আগামী দিনগুলোতে সরকারের গৃহীত সিদ্ধান্তের মাধ্যমে স্পষ্ট হবে।
দেশনেত্র দৃষ্টি ছাড়িয়ে