সম্প্রতি উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ের পরীক্ষায় প্রায় ৩৬ শতাংশ শিক্ষার্থীর অনুপস্থিতি দেশের শিক্ষাব্যবস্থার ভঙ্গুর দশার এক রূঢ় প্রতিফলন হিসেবে দেখা দিয়েছে। এই বিপুল সংখ্যক শিক্ষার্থীর পরীক্ষা বর্জন কেবল পরিসংখ্যানের বিষয় নয়, বরং এটি জাতীয় পর্যায়ে এক গভীর মানসিক ধাক্কা। অর্থনীতি ও ভূ-রাজনীতি নিয়ে রাষ্ট্র যখন নানা উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনায় ব্যস্ত, তখন নতুন প্রজন্মের এই নীরব বিদ্রোহ শিক্ষার ভবিষ্যৎকে এক অনিশ্চিত গন্তব্যের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। বিশ্লেষকদের মতে, এই অনুপস্থিতি শিক্ষাব্যবস্থার প্রতি শিক্ষার্থীদের ‘নো-কনফিডেন্স’ বা আস্থাহীনতার বহিঃপ্রকাশ হতে পারে।
জুলাইয়ের গণ-অভ্যুত্থানে ছাত্রসমাজ যে অসামান্য ভূমিকা রেখেছিল, তার প্রেক্ষাপটে অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্ব ছিল তাদের আকাঙ্ক্ষা ও বেদনাকে গুরুত্বের সঙ্গে অনুধাবন করা। কিন্তু বাস্তবতা হলো, নতুন সরকার এবং সমাজের নীতিনির্ধারকরা যুবসমাজের কথা শোনার চেয়ে নিজেদের এজেন্ডা বাস্তবায়নেই বেশি মনোযোগী। জুলাইয়ের সেই পরিবর্তনের পর শিক্ষাঙ্গনে যে অস্থিরতা, শিক্ষকদের অসম্মান এবং দলীয়করণের চর্চা অব্যাহত রয়েছে, তা শিক্ষার্থীদের মনে এক ধরনের অনীহা তৈরি করেছে। মব কালচার বা গোষ্ঠীগত আগ্রাসনের ফলে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো যে অস্থিতিশীল হয়ে উঠেছে, তা তরুণদের শিক্ষার প্রতি আগ্রহ কমিয়ে দিচ্ছে কি না, তা গভীরভাবে খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
শিক্ষাবিদ ও সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা হোসেন জিল্লুর রহমানের মতে, সমস্যা সমাধানে এখন প্রয়োজন ‘শোনার সংস্কৃতি’ গড়ে তোলা। নীতিনির্ধারকরা নিজেদের দৃষ্টিভঙ্গি চাপিয়ে না দিয়ে বরং শিক্ষার্থী, অভিভাবক এবং শিক্ষকদের কথা শোনার মানসিকতা তৈরি করতে হবে। যদি রাষ্ট্র এই প্রজন্মকে তার মনোযোগের কেন্দ্রে রাখতে ব্যর্থ হয়, তবে ট্রিলিয়ন ডলার অর্থনীতির স্বপ্ন কেবল কাগজেই সীমাবদ্ধ থাকবে। কারণ, একটি জাতি গঠনের মূল কারিগর এই তরুণরাই। যদি তারা রাষ্ট্র ও শিক্ষা থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়, তবে ভবিষ্যতে বড় ধরনের সামাজিক অস্থিরতা অনিবার্য হয়ে উঠবে।
বর্তমানে শিক্ষাব্যবস্থায় যে সংকট তৈরি হয়েছে, তা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। জুলাই আন্দোলনের পরবর্তী সময়ে অনেক অনভিপ্রেত ঘটনায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরিবেশ বিষিয়ে উঠেছে। আন্দোলনের দাবিদারদের একাংশের কর্মকাণ্ডে শিক্ষার পরিবেশ বিঘ্নিত হওয়া এবং প্রতিষ্ঠানের ভেতরে বিশৃঙ্খলা তৈরি হওয়া শিক্ষার্থীদের মধ্যে এক ধরনের নিরাপত্তাহীনতা ও হতাশা সৃষ্টি করেছে। এই প্রেক্ষাপটে, রাষ্ট্রকে এখন আত্মমূল্যায়নের পথে হাঁটতে হবে। কেবল চর্বিত চর্বণ বা গতানুগতিক সমাধান দিয়ে এই বিশাল মেধাশূন্যতাকে ঠেকানো সম্ভব নয়। এখনই সময় শিক্ষাব্যবস্থাকে ঢেলে সাজানোর এবং শিক্ষার্থীদের আস্থার জায়গায় ফিরিয়ে আনার। অন্যথায়, মেধাবী এই প্রজন্মের বিমুখতা জাতির জন্য দীর্ঘমেয়াদী সংকটের কারণ হয়ে দাঁড়াবে।
দেশনেত্র দৃষ্টি ছাড়িয়ে