১৯৫০ সালের বিশ্বকাপ ফুটবল ফাইনাল ছিল ব্রাজিলের ফুটবল ইতিহাসের এক ক্ষতবিক্ষত অধ্যায়। মারাকানা স্টেডিয়ামে উরুগুয়ের কাছে পরাজয়ের পর পুরো ব্রাজিল শোকে স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল। সেই ম্যাচে ৯ বছরের এক বালক এডসন আরান্তেস দো নাসিমেন্তো, যিনি পরবর্তীতে বিশ্বজুড়ে ‘পেলে’ নামে পরিচিত হন, তার বাবাকে অঝোরে কাঁদতে দেখেছিল। সেদিনই ফুটবলের এই খুদে জাদুকর তার বাবাকে কথা দিয়েছিল, সে একদিন ব্রাজিলকে বিশ্বকাপ এনে দেবে। বাবার সেই অশ্রুভেজা চোখের স্মৃতিই ছিল পেলের ফুটবল ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় অনুপ্রেরণা।
পেলে বেড়ে উঠেছিলেন দারিদ্র্যের চরম বাস্তবতার মধ্যে। তাঁর বাবা নিজেও একজন পেশাদার ফুটবলার ছিলেন, কিন্তু ইনজুরির কারণে ক্যারিয়ার বিসর্জন দিয়ে পরিচ্ছন্নতাকর্মীর কাজ নিতে হয়েছিল। পেলের মা চেয়েছিলেন ছেলে যেন পড়াশোনা করে কোনো সম্মানজনক পেশায় যুক্ত হোক, কারণ ফুটবলের অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ সম্পর্কে তিনি শঙ্কিত ছিলেন। কিন্তু নিয়তির লিখন ছিল ভিন্ন। পকেট গড়ের মাঠ হলেও পেলের রক্তে মিশে ছিল ফুটবল। বল কেনার সামর্থ্য না থাকায় কাপড়ের তৈরি বল নিয়েই বস্তির অলিগলিতে ড্রিবলিংয়ের চর্চা করতেন তিনি।
১৯৫৮ সালের সুইডেন বিশ্বকাপ ছিল পেলের ক্যারিয়ারের প্রথম বড় মঞ্চ। এর আগের বিশ্বকাপগুলোতে ব্রাজিল নানামুখী ব্যর্থতার সম্মুখীন হয়েছিল। বিশেষ করে ১৯৫৪ সালের ‘ব্যাটল অব বার্ন’ হাঙ্গেরির সাথে ব্রাজিলের ফুটবল ইতিহাসে কলঙ্কিত হয়ে আছে। ব্রাজিলের চিরচেনা ‘জিঙ্গা’ স্টাইল ফুটবল নিয়ে তখন প্রবল বিতর্ক চলছিল। ইউরোপীয় ঘরানার রক্ষণাত্মক ফুটবল না খেললে কাপ জেতা অসম্ভব—এমন ধারণা প্রবল ছিল। তবে ১৭ বছরের কিশোর পেলে তার সহজাত শৈল্পিক ফুটবল বজায় রাখতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ ছিলেন।
সুইডেন বিশ্বকাপের ফাইনালে যখন ব্রাজিল ৪ মিনিটে পিছিয়ে পড়ে, তখন অনেকের মনেই ১৯৫০ সালের দুঃস্মৃতি জেগে উঠেছিল। কিন্তু পেলে এবং তাঁর দল হার মানেনি। মাঠে নামল তাদের সেই নান্দনিক ‘জিঙ্গা’ ফুটবল। ৫৫ মিনিটে পেলের সেই ঐতিহাসিক গোলটি ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা মুহূর্ত হিসেবে আজও স্মরণীয়। বুক দিয়ে বল নামিয়ে ডিফেন্ডারকে পরাস্ত করে ভলি থেকে গোল করা—এটি ছিল এক কিশোরের অসামান্য প্রতিভার বহিঃপ্রকাশ। শেষ পর্যন্ত ব্রাজিল ৫-২ গোলে সুইডেনকে হারিয়ে প্রথমবার বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন হয়। ম্যাচ শেষে পেলে আবেগে আপ্লুত হয়ে পড়েছিলেন, কারণ তিনি তাঁর বাবাকে দেওয়া সেই ছোট্টবেলার প্রতিজ্ঞা পূরণ করতে পেরেছিলেন। সেদিন থেকেই বিশ্বমঞ্চে ব্রাজিলের ফুটবল রাজত্বের সূচনা হয় এবং পেলে হয়ে ওঠেন ফুটবলের অবিসংবাদিত রাজা।
দেশনেত্র দৃষ্টি ছাড়িয়ে