চলমান ফুটবল বিশ্বকাপ যেন নাটকীয়তা আর রোমাঞ্চের এক অনন্য মঞ্চ, যেখানে প্রতিটি ম্যাচেই খেলোয়াড়দের অবিস্মরণীয় পারফরম্যান্স, অপ্রত্যাশিত ফলাফল এবং শেষ মুহূর্তের গোলের উন্মাদনা দর্শকদের মন্ত্রমুগ্ধ করে রাখছে। বিশ্ব ফুটবলের এই মহাযজ্ঞে পরাশক্তিদের দাপটের পাশাপাশি উদীয়মান দলগুলোর চমকপ্রদ উত্থান টুর্নামেন্টকে করে তুলেছে আরও আকর্ষণীয়।
গ্রুপ পর্ব থেকেই অনেক দল নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করে নকআউট পর্বে জায়গা করে নিয়েছে। ইকুয়েডর ২-০ গোলে মেক্সিকোকে হারিয়ে শেষ ষোলোতে নিজেদের স্থান নিশ্চিত করে, যা ছিল তাদের আত্মবিশ্বাসের প্রতীক। একইভাবে, কিলিয়ান এমবাপ্পের জোড়া গোলে সুইডেনকে ৩-০ ব্যবধানে পরাজিত করে ফ্রান্সও তাদের দাপট বজায় রাখে। নরওয়ে, আর্লিং হলান্ডের ৮৬ মিনিটের গোলে আইভরিকোস্টকে ২-১ ব্যবধানে হারিয়ে নকআউট পর্বে জায়গা করে নেয়, যা তাদের সমর্থকদের মধ্যে ব্যাপক উচ্ছ্বাস তৈরি করে। মরক্কোও শেষ ৩২-এর ম্যাচে নেদারল্যান্ডসকে টাইব্রেকারে ৩-২ গোলে হারিয়ে অভাবনীয় জয় ছিনিয়ে নেয়, অতিরিক্ত সময়ে ১-১ সমতার পর তাদের এই জয় ছিল এক ঐতিহাসিক মুহূর্ত।
এই বিশ্বকাপে ব্যক্তিগত নৈপুণ্যও ছিল চোখে পড়ার মতো। লিওনেল মেসি তার ধারাবাহিকতা ধরে রেখে বিশ্বকাপের ইতিহাসে নতুন রেকর্ড গড়েন, টানা সাতটি ভিন্ন বিশ্বকাপে গোল করে ফুটবলের ইতিহাসে এক অনন্য নজির স্থাপন করেন। ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোও উজবেকিস্তানের বিপক্ষে ৫-০ গোলের বিশাল জয়ে জোড়া গোল করে তার জাদুকরী উপস্থিতি জানান দেন। ইংল্যান্ডের স্ট্রাইকার হ্যারি কেইন পানামার বিপক্ষে গোল করে ইংল্যান্ডের হয়ে বিশ্বকাপের সর্বোচ্চ গোলদাতা হিসেবে নিজের নাম লেখান। কিলিয়ান এমবাপ্পে সুইডেন ও ইরাকের বিপক্ষে ম্যাচে জোড়া গোল করে ফ্রান্সের জয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন, যা তাকে টুর্নামেন্টের অন্যতম সেরা খেলোয়াড় হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে।
কিছু দল তাদের অভিষেক আসরেই চমক সৃষ্টি করেছে। কেপ ভার্দে প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপে খেলতে এসে গ্রুপ পর্বে অপরাজিত থেকে নকআউট পর্বে উঠে ইতিহাস সৃষ্টি করে। সৌদি আরবের বিপক্ষে গোলশূন্য ড্র করে তারা এই কৃতিত্ব অর্জন করে। দক্ষিণ আফ্রিকাও দক্ষিণ কোরিয়াকে ১-০ গোলে হারিয়ে প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে জায়গা করে নেয়, যা তাদের জন্য এক ঐতিহাসিক অর্জন। ডিআর কঙ্গোও নকআউট নিশ্চিত করার পর জাতীয় পতাকা হাতে স্যামুয়েল মুতুসামির উচ্ছ্বাস ছিল লক্ষণীয়। ইরানের গোলকিপার আলীরেজা বেইরানভান্দ বেলজিয়ামের বিপক্ষে অসাধারণ ১৫টি সেভ করে দলকে গোলশূন্য ড্র এনে দেন, যা ছিল টুর্নামেন্টের অন্যতম সেরা গোলকিপিং পারফরম্যান্স।
অনেক ম্যাচই শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত উত্তেজনা ধরে রেখেছিল। তুরস্ক, প্রথম দুই ম্যাচ হেরেও শেষ বাঁশির ঠিক আগে গোল করে যুক্তরাষ্ট্রকে ৩-২ গোলে হারিয়ে বিশ্বকাপ থেকে বিদায় নেয়, যদিও এই জয় তাদের জন্য ছিল সান্ত্বনা পুরস্কার। ঘানা পানামার বিপক্ষে অতিরিক্ত সময়ের পঞ্চম মিনিটে ক্যালেব ইরেনকির জয়সূচক গোলে ১-০ ব্যবধানে জিতে নকআউট নিশ্চিত করে। আইভরিকোস্ট ইকুয়েডরের বিপক্ষে ৯০ মিনিটে আমাদ দিয়ালোর গোলে ১-০ ব্যবধানে জয়লাভ করে। জার্মানি আইভরিকোস্টের বিপক্ষে পিছিয়ে পড়েও বদলি নামা ডেনিজ উনদাভের জোড়া গোলে ২-১ ব্যবধানে জয় ছিনিয়ে নেয়। জাপানের খেলোয়াড়রা নেদারল্যান্ডসের বিপক্ষে দুইবার পিছিয়ে পড়েও শেষ মুহূর্তের গোলে ড্র করার আনন্দ উপভোগ করে।
সেনেগাল ইরাককে ৫-০ গোলে উড়িয়ে দিয়ে নিজেদের শক্তি প্রদর্শন করে। ব্রাজিল স্কটল্যান্ড ও হাইতির বিপক্ষে যথাক্রমে ৩-০ ও ৩-০ গোলে জয়লাভ করে তাদের দাপট বজায় রাখে। নেইমার প্রায় তিন বছর পর দলে ফিরে স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে বদলি হিসেবে মাঠে নামেন। স্পেন উরুগুয়েকে ১-০ গোলে হারিয়ে গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন হয়ে নকআউটে ওঠে। নেদারল্যান্ডস তিউনিসিয়াকে ৩-১ গোলে পরাজিত করে ‘এফ’ গ্রুপের শীর্ষস্থান দখল করে। মেক্সিকো চেক প্রজাতন্ত্রকে ৩-০ গোলে হারিয়ে স্বাগতিক হিসেবে দ্বিতীয় রাউন্ডে ওঠে। কলম্বিয়া ডিআর কঙ্গোকে ১-০ গোলে হারিয়ে নকআউট পর্ব নিশ্চিত করে। সুইজারল্যান্ড বসনিয়া ও হার্জেগোভিনার বিপক্ষে ৪-১ গোলে জয়লাভ করে তাদের শক্তিমত্তা প্রমাণ করে।
এই বিশ্বকাপ ফুটবলের এক রঙিন উৎসব, যেখানে প্রতিটি গোল, প্রতিটি সেভ, প্রতিটি জয় বা ড্র নতুন নতুন গল্প তৈরি করছে। খেলোয়াড়দের আবেগ, কোচদের কৌশল এবং সমর্থকদের উন্মাদনা মিলে এই টুর্নামেন্টকে করে তুলেছে অবিস্মরণীয়। আগামী দিনগুলোতে আরও নাটকীয়তা এবং শ্বাসরুদ্ধকর মুহূর্তের অপেক্ষায় আছে ফুটবল বিশ্ব।
দেশনেত্র দৃষ্টি ছাড়িয়ে