কম্বোডিয়ার সাইবার প্রতারকদের কবল থেকে মুক্তি পেয়ে আরও ১০৯ জন বাংলাদেশি দেশে ফিরেছেন। সম্প্রতি সন্ধ্যায় একটি বিশেষ ফ্লাইটে তারা ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করেন। এই প্রত্যাবর্তনের ঘটনা মানবপাচার এবং আন্তর্জাতিক সাইবার অপরাধ চক্রের বিরুদ্ধে চলমান লড়াইয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। ভুক্তভোগীরা দীর্ঘদিন ধরে কম্বোডিয়ার বিভিন্ন প্রত্যন্ত অঞ্চলে অবস্থিত অবৈধ সাইবার কেলেঙ্কারির আস্তানায় জিম্মি ছিলেন এবং জোরপূর্বক প্রতারণার কাজে নিয়োজিত ছিলেন।
বাংলাদেশ সরকার, বিশেষ করে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং থাইল্যান্ডে অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাসের (যা কম্বোডিয়ারও দায়িত্বে) নিরলস প্রচেষ্টায় এই বিপুল সংখ্যক বাংলাদেশিকে উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে। আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা (আইওএম) এবং কম্বোডিয়ার স্থানীয় আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সহযোগিতায় জটিল প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে তাদের দেশে ফিরিয়ে আনা হয়। বিমানবন্দরে পৌঁছানোর পর তাদের প্রাথমিক স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও অন্যান্য আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করা হয়। এরপর পরিবারের কাছে হস্তান্তরের ব্যবস্থা করা হয়, যা তাদের দীর্ঘদিনের মানসিক ও শারীরিক যন্ত্রণার অবসান ঘটিয়েছে।
এই বাংলাদেশিরা মূলত উচ্চ বেতনের চাকরির প্রলোভনে কম্বোডিয়ায় পাড়ি জমিয়েছিলেন। দালাল চক্র তাদের আইটি বা কাস্টমার সার্ভিস এক্সিকিউটিভের মতো আকর্ষণীয় পদের মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দিয়ে দেশ থেকে নিয়ে যায়। তবে সেখানে পৌঁছানোর পর তাদের পাসপোর্ট জব্দ করা হয় এবং জোরপূর্বক সাইবার প্রতারণার কাজে নিযুক্ত করা হয়। এসব প্রতারণা মূলত ‘পিগ বাচারিং’ (pig butchering) স্কিম নামে পরিচিত, যেখানে অনলাইনে প্রেমের ফাঁদ পেতে বা ক্রিপ্টোকারেন্সিতে বিনিয়োগের মিথ্যা আশ্বাস দিয়ে ভুক্তভোগীদের কাছ থেকে বিপুল অর্থ হাতিয়ে নেওয়া হয়। দিনের পর দিন দীর্ঘ সময় ধরে তাদের এসব অবৈধ কাজে বাধ্য করা হতো, অন্যথায় শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হতে হতো।
কম্বোডিয়া, মিয়ানমার এবং লাওসের মতো দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার কিছু দেশে এই ধরনের সাইবার প্রতারণা কেন্দ্রগুলো সাম্প্রতিক সময়ে ব্যাপক বিস্তার লাভ করেছে। মূলত সংগঠিত অপরাধী চক্র, যাদের মধ্যে চীনা সিন্ডিকেটগুলোও জড়িত, এই অবৈধ কার্যক্রম পরিচালনা করে থাকে। এই অঞ্চলগুলোতে আইনের শিথিলতা এবং সীমান্ত সুরক্ষা দুর্বল হওয়ায় মানবপাচারকারীরা সহজেই তাদের নেটওয়ার্ক গড়ে তুলতে সক্ষম হয়েছে। বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলোর কর্মপ্রত্যাশী তরুণরা, যারা উন্নত জীবনের সন্ধানে বিদেশে যেতে চায়, সহজেই এই চক্রের ফাঁদে পড়ে। এটি কেবল বাংলাদেশের একার সমস্যা নয়, বরং আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে এটি একটি গুরুতর মানবিক সংকট তৈরি করেছে।
অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে বাংলাদেশ সরকার এই ধরনের মানবপাচার এবং সাইবার অপরাধ দমনে বদ্ধপরিকর। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং সংশ্লিষ্ট আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলো যৌথভাবে কাজ করছে এসব চক্রকে চিহ্নিত করতে এবং ভুক্তভোগীদের উদ্ধার করতে। তবে, এসব অপরাধী চক্রের সুদূরপ্রসারী নেটওয়ার্ক এবং প্রত্যন্ত অঞ্চলে তাদের আস্তানাগুলো শনাক্ত করা বেশ চ্যালেঞ্জিং। অনেক সময় ভুক্তভোগীরা নিজেরাই ভয়ে বা হুমকির কারণে তথ্য দিতে চান না, যা উদ্ধার অভিযানকে আরও কঠিন করে তোলে।
এই ধরনের ঘটনা রোধে সরকার ব্যাপক সচেতনতামূলক কর্মসূচি হাতে নিয়েছে। কর্মপ্রত্যাশীদের বিদেশ গমনের আগে সঠিক তথ্য যাচাই করা এবং বৈধ এজেন্সির মাধ্যমে যাওয়ার জন্য উৎসাহিত করা হচ্ছে। পাশাপাশি, দালাল চক্রের বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে। আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সাথে সহযোগিতা জোরদার করা হচ্ছে যাতে আন্তঃসীমান্ত অপরাধ দমনের পাশাপাশি ভুক্তভোগীদের দ্রুত ও নিরাপদে দেশে ফিরিয়ে আনা যায়। এই ১০৯ জন বাংলাদেশির প্রত্যাবর্তনের ঘটনা একদিকে যেমন সরকারের সাফল্যের ইঙ্গিত বহন করে, তেমনি অন্যদিকে মানবপাচার ও সাইবার অপরাধের বিরুদ্ধে চলমান যুদ্ধে আরও সতর্ক ও সক্রিয় থাকার প্রয়োজনীয়তা স্মরণ করিয়ে দেয়।
দেশনেত্র দৃষ্টি ছাড়িয়ে