আন্তর্জাতিক ফুটবলে গোলমেশিন হিসেবে পরিচিতি পাওয়া আর্লিং হলান্ড আবারও নিজের জাত চেনালেন। আইভরি কোস্টের বিপক্ষে নরওয়ের ২-১ ব্যবধানের রোমাঞ্চকর জয়ে শেষ ষোলো নিশ্চিত করেছে তাঁর দল, আর এই জয়ে মূল ভূমিকা পালন করেছেন হলান্ড নিজেই। ম্যাচের ৮৬ মিনিটে লক্ষ্যভেদ করে দলকে নকআউট পর্বে নিয়ে যান এই তারকা স্ট্রাইকার। চলতি টুর্নামেন্টে ৩ ম্যাচে ৫ গোল করে গোলদাতার তালিকায় কিলিয়ান এমবাপ্পে ও লিওনেল মেসির ঠিক পেছনেই অবস্থান করছেন তিনি।
আইভরি কোস্টের বিপক্ষে করা জয়সূচক গোলটিকে হলান্ডের ক্যারিয়ারের অন্যতম সহজ গোল হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। সতীর্থ প্যাট্রিক বার্গের নিখুঁত পাস থেকে কেবল আলতো টোকায় বল জালে জড়ানোই ছিল তাঁর কাজ। তবে গোলটি সহজ হলেও নরওয়ের ফুটবল ইতিহাসে এর গুরুত্ব অপরিসীম। দীর্ঘ সময় পর বড় কোনো টুর্নামেন্টে অংশ নিয়ে নকআউট পর্বে জায়গা করে নেওয়া নরওয়ের জন্য এটি এক ঐতিহাসিক মুহূর্ত। ২০০০ সালের ইউরোর পর নরওয়ে আর কোনো বড় আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্টে খেলার যোগ্যতা অর্জন করতে পারেনি। এবারের আসরে তাদের এই স্বপ্নযাত্রার মূল কাণ্ডারি নরওয়েজিয়ান এই গোলমেশিন।
আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারে হলান্ডের গোল পাওয়ার পরিসংখ্যান এককথায় অবিশ্বাস্য। ৫৩টি আন্তর্জাতিক ম্যাচে অংশ নিয়ে তিনি ইতিমধ্যে ৬০টি গোল নিজের ঝুলিতে পুরেছেন। গড়ে প্রতি ৭২ মিনিটে একটি করে গোল করেছেন এই ২৫ বছর বয়সী স্ট্রাইকার। মলদোভা ও জিব্রাল্টারের মতো দলের বিপক্ষে যেমন তাঁর হ্যাটট্রিক রয়েছে, তেমনি রোমানিয়া ও কাজাখস্তানের বিরুদ্ধেও রয়েছে দুর্দান্ত পারফরম্যান্স। মজার বিষয় হলো, তাঁর প্রথম ৫৫টি গোলের একটিও কোনো বড় আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্টে আসেনি, কারণ নরওয়ে দীর্ঘদিন ধরে কোনো বিশ্বমঞ্চে খেলার সুযোগ পায়নি।
নরওয়ের হয়ে খেলা সর্বশেষ ১৩টি প্রতিযোগিতামূলক ম্যাচের প্রতিটিতেই গোল করার অনন্য রেকর্ড গড়েছেন হলান্ড। এই সময়ে তিনি মোট ২৫টি গোল করেছেন। যদিও এর মধ্যে মলদোভা, ইসরায়েল কিংবা এস্তোনিয়ার মতো দুর্বল প্রতিপক্ষ ছিল, তবে শক্তিশালী ইতাহির বিপক্ষে ৪-১ ব্যবধানের জয়ের ম্যাচেও তাঁর পা থেকে এসেছে জোড়া গোল। বর্তমান টুর্নামেন্টে ইরাক ও সেনেগালের বিপক্ষেও চমৎকার পারফরম্যান্স উপহার দিয়েছেন তিনি। কেবল ফ্রান্সের বিপক্ষে গ্রুপ পর্বের শেষ ম্যাচে তাঁকে বিশ্রাম দেওয়া হয়েছিল, যার ফলে কিলিয়ান এমবাপ্পের মুখোমুখি লড়াইটি দেখার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়েছেন ফুটবলপ্রেমীরা।
হলান্ডের এই অবিশ্বাস্য গোলের গতি ফুটবল বিশ্বে নতুন এক আলোচনার জন্ম দিয়েছে—তিনি কি পারবেন ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর আন্তর্জাতিক গোলের রেকর্ড স্পর্শ করতে? বর্তমানে আন্তর্জাতিক ফুটবলে সর্বোচ্চ গোলদাতা রোনালদো পর্তুগালের হয়ে ২৩আই ম্যাচে ১৪৫টি গোল করেছেন, যা গড়ে প্রতি ১.৫৯ ম্যাচে একটি গোল। অন্যদিকে, হলান্ড গড়ে প্রতি ০.৮৮ ম্যাচে একটি করে গোল করছেন। এই ধারা বজায় রাখলে মাত্র ১২৮তম ম্যাচেই তিনি রোনালদোর রেকর্ড ছুঁয়ে ফেলবেন।
যদি নরওয়ে প্রতি বছর বাছাইপর্ব, প্রীতি ম্যাচ ও বিভিন্ন টুর্নামেন্ট মিলিয়ে গড়ে ১০টি করে আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলে, তবে ৩২ বছর বয়সেই রোনালদোর রেকর্ড ভেঙে নতুন ইতিহাস গড়বেন হলান্ড। আরও বড় হিসাব করলে, নরওয়ে যদি ২০৪০ সাল পর্যন্ত প্রতিটি বড় টুর্নামেন্টে খেলার যোগ্যতা অর্জন করে এবং হলান্ড ৪১ বছর বয়স পর্যন্ত খেলা চালিয়ে যান, তবে তাঁর সম্ভাব্য আন্তর্জাতিক গোলসংখ্যা দাঁড়াবে ২৬০-এ! যা ফুটবল ইতিহাসের যেকোনো স্ট্রাইকারের জন্য এক কল্পনাতীত মাইলফলক।
দেশনেত্র দৃষ্টি ছাড়িয়ে