সম্প্রতি এক গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্যে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী দ্ব্যর্থহীনভাবে ঘোষণা করেছেন যে, ধর্মের নামে সংঘটিত যেকোনো ধরনের সন্ত্রাসবাদকে বাংলাদেশ কোনোভাবেই সমর্থন করে না। এটি বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের পররাষ্ট্রনীতির একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ এবং বিশ্বজুড়ে শান্তি ও স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠায় দেশটির অঙ্গীকারের প্রতিফলন। তার এই মন্তব্য এমন এক সময়ে এলো যখন আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে ধর্মীয় উগ্রবাদ ও সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে সম্মিলিত প্রচেষ্টার গুরুত্ব ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছে।
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী জোর দিয়ে বলেন, কোনো ধর্মই সন্ত্রাস বা সহিংসতাকে সমর্থন করে না। সন্ত্রাসীরা নিজেদের হীন রাজনৈতিক বা ব্যক্তিগত স্বার্থ চরিতার্থ করার জন্য ধর্মের পবিত্র নামকে অপব্যবহার করে। তিনি উল্লেখ করেন, ইসলামসহ বিশ্বের সকল প্রধান ধর্মই শান্তি, ন্যায়বিচার, মানবতা এবং সহাবস্থানের শিক্ষা দেয়। এই মৌলিক নীতিগুলোকে লঙ্ঘন করে যারা সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে লিপ্ত হয়, তারা কখনোই ধর্মের প্রকৃত অনুসারী হতে পারে না। বাংলাদেশ বিশ্বাস করে যে, ধর্মের অপব্যাখ্যা করে সমাজে বিভেদ ও হানাহানি সৃষ্টির অপচেষ্টা কঠোর হাতে দমন করা প্রয়োজন।
বাংলাদেশ একটি ধর্মপ্রাণ, কিন্তু ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র হিসেবে পরিচিত। দেশটির সংবিধানে সকল ধর্মের প্রতি সমান শ্রদ্ধাবোধের কথা বলা হয়েছে এবং সকল নাগরিকের ধর্মীয় স্বাধীনতা নিশ্চিত করা হয়েছে। এই মূল্যবোধগুলো দেশের মানুষের মধ্যে শান্তি ও সহাবস্থানকে উৎসাহিত করে। তাই ধর্মের ছদ্মবেশে সহিংসতা ছড়ানোর যেকোনো অপপ্রয়াসকে রাষ্ট্র কঠোরভাবে মোকাবিলা করে আসছে। দেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীগুলো সন্ত্রাসবাদ দমনে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে এবং তাদের এই প্রচেষ্টা আন্তর্জাতিক মহলেও প্রশংসিত হয়েছে।
সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে বাংলাদেশের ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি অত্যন্ত সুদৃঢ়। বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারসহ পূর্ববর্তী সরকারগুলোও সন্ত্রাসবাদের অর্থায়ন বন্ধ, উগ্রবাদী প্রচারণা রোধ এবং জড়িতদের বিচারের আওতায় আনার জন্য বিভিন্ন আইনি কাঠামো ও নীতিমালা প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করেছে। জঙ্গিবাদ ও উগ্রবাদের বিরুদ্ধে সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধিতেও সরকার বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান এবং গণমাধ্যমের মাধ্যমে সঠিক ধর্মীয় জ্ঞান প্রচারের উপর গুরুত্বারোপ করা হচ্ছে, যাতে তরুণ প্রজন্ম উগ্রবাদী প্ররোচনা থেকে দূরে থাকে।
আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও বাংলাদেশ সন্ত্রাস দমনে সক্রিয় ও গঠনমূলক ভূমিকা পালন করছে। জাতিসংঘ, ওআইসি, সার্ক এবং অন্যান্য আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক সংস্থায় বাংলাদেশ সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে জোরালো বক্তব্য রেখেছে এবং সম্মিলিত পদক্ষেপের আহ্বান জানিয়েছে। বাংলাদেশ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক চুক্তি ও কনভেনশনে স্বাক্ষর করেছে এবং সেগুলোর বাস্তবায়নে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বৃদ্ধির মাধ্যমে বৈশ্বিক সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলায় বাংলাদেশ সর্বদা প্রস্তুত বলে প্রতিমন্ত্রী উল্লেখ করেন।
দেশের অভ্যন্তরে শান্তি ও সম্প্রীতি বজায় রাখার গুরুত্ব তুলে ধরে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বলেন, সরকার ধর্মীয় সম্প্রীতি বিনষ্টকারী যেকোনো গোষ্ঠী বা ব্যক্তির বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে বদ্ধপরিকর। বাংলাদেশের মতো বহুত্ববাদী সমাজে ধর্মীয় সম্প্রীতি রক্ষা করা অত্যন্ত জরুরি। সমাজের সকল স্তরের মানুষকে নিয়ে সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে সচেতনতা তৈরি করা এবং তাদের এই অপশক্তির বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান জানানো হয়।
পরিশেষে, পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী পুনর্ব্যক্ত করেন যে, বাংলাদেশ সন্ত্রাসমুক্ত একটি শান্তিপূর্ণ বিশ্ব গঠনে তার অঙ্গীকারে অটল। ধর্মের নামে যেকোনো ধরনের উগ্রবাদ ও সন্ত্রাসবাদ মোকাবেলায় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করার দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেছে বাংলাদেশ। এই অবস্থান শুধু দেশের অভ্যন্তরীণ শান্তিই নয়, আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক নিরাপত্তা রক্ষায়ও বাংলাদেশের ইতিবাচক ভূমিকা তুলে ধরে।
দেশনেত্র দৃষ্টি ছাড়িয়ে