আধুনিক প্রযুক্তির বিস্ময় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই (AI) আমাদের দৈনন্দিন জীবনকে করে তুলেছে সহজতর। ই-মেইল লেখা থেকে শুরু করে ছবি বা ভিডিও তৈরি—সবকিছুই এখন আঙুলের ডগায়। তবে এই ডিজিটাল সুবিধার আড়ালে লুকিয়ে আছে এক উদ্বেগজনক সত্য, যা পরিবেশের ওপর ফেলছে গভীর প্রভাব। সাম্প্রতিক গবেষণায় উঠে এসেছে যে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রতিটি কমান্ড বা অনুরোধ পূরণ করতে বিপুল পরিমাণ সুপেয় পানির প্রয়োজন হচ্ছে। বিশেষ করে ডেটাসেন্টারগুলোর শীতলীকরণ প্রক্রিয়ায় এই পানির ব্যবহার এক বিশাল চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মডেলগুলো যখন কোনো তথ্য প্রক্রিয়াজাত করে, তখন তা প্রচুর তাপ উৎপন্ন করে। এই তাপ নিয়ন্ত্রণের জন্য ডেটাসেন্টারগুলোতে অত্যাধুনিক কুলিং সিস্টেম ব্যবহৃত হয়, যা বায়ুর পরিবর্তে এখন পানি ব্যবহার করতে বাধ্য হচ্ছে। কারণ, বাতাসের তুলনায় পানির তাপ শোষণ ক্ষমতা প্রায় চার হাজার গুণ বেশি। ইউনিভার্সিটি অব টেক্সাস অ্যাট অস্টিনের গবেষক নাভিদ সালেহসহ অনেকের মতে, একটি এআই মডেলকে দিয়ে কোনো ছবি তৈরি করাতে প্রায় দুই গ্লাস সুপেয় পানি খরচ হয়। শুধু তাই নয়, একটি ১০ সেকেন্ডের ভিডিও তৈরি করতে খরচ হতে পারে ২০ গ্লাস পানি।
২০২৫ সালের একটি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বিশ্বজুড়ে ডেটাসেন্টারগুলো শীতল রাখতে বছরে প্রায় ৫৫০ বিলিয়ন লিটার সুপেয় পানি ব্যবহৃত হচ্ছে, যা বোতলজাত পানির বৈশ্বিক চাহিদার সমতুল্য। এই পরিস্থিতি বিশ্বজুড়ে সুপেয় পানির সংকটকে আরও ঘনীভূত করতে পারে। যখন পৃথিবীর অনেক অঞ্চলই তীব্র পানি সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, তখন প্রযুক্তির এই যান্ত্রিক তৃষ্ণা মেটানো কতটা টেকসই হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
তবে এর মানে এই নয় যে, আমরা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার পুরোপুরি বন্ধ করে দেব। বরং প্রযুক্তির ব্যবহারে আমাদের আরও সচেতন ও মিতব্যয়ী হতে হবে। নিছক বিনোদন বা অপ্রয়োজনীয় কাজে এআই ব্যবহারের আগে আমাদের ভাবতে হবে এর পেছনে থাকা পরিবেশগত খরচের কথা। প্রতিটি ই-মেইল ড্রাফট বা ছবি তৈরির অনুরোধ করার সময় মনে রাখা প্রয়োজন যে, এই ডিজিটাল প্রক্রিয়ার পেছনে রয়েছে বিদ্যুৎ, তাপ ও পানির এক নীরব ব্যয়। আগামী প্রজন্মের জন্য সুপেয় পানির নিশ্চয়তা বজায় রাখতে হলে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহারে ব্যক্তিক পর্যায় থেকে দায়বদ্ধতা তৈরি করা এখন সময়ের দাবি।
দেশনেত্র দৃষ্টি ছাড়িয়ে