বিশ্বখ্যাত প্রযুক্তি উদ্যোক্তা ইলন মাস্কের নিত্যনতুন ও চমকপ্রদ সব পরিকল্পনা সবসময়ই বিশ্বজুড়ে আলোড়ন সৃষ্টি করে। তবে তার সাম্প্রতিক একটি উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনা নিয়ে প্রযুক্তি বিশ্বে দেখা দিয়েছে তীব্র বিতর্ক ও সংশয়। মাস্কের প্রস্তাবিত ‘অরবিটাল ডেটা সেন্টার’ বা মহাকাশভিত্তিক ডেটা সেন্টার স্থাপনের পরিকল্পনাকে ঘিরে শুধু সাধারণ প্রযুক্তিবিদরাই নন, খোদ সফটব্যাংকের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) মাসায়োশি সনসহ শীর্ষস্থানীয় প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞরা প্রশ্ন তুলেছেন।
ইলন মাস্কের দূরদর্শী চিন্তাভাবনার অংশ হিসেবে স্পেসএক্স এবং স্টারলিংক নেটওয়ার্কের ওপর ভিত্তি করে মহাকাশে ডেটা সেন্টার স্থাপনের এই পরিকল্পনা সামনে আসে। ধারণা করা হচ্ছে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) এবং বিশাল ডেটা প্রক্রিয়াকরণের জন্য পৃথিবীর বাইরে মহাকাশের কক্ষপথে সার্ভার স্থাপন করা হবে, যা সরাসরি সৌরশক্তি ব্যবহার করে চলবে। মাস্কের সমর্থকদের দাবি, এই প্রযুক্তি বিশ্বব্যাপী নিরবচ্ছিন্ন ইন্টারনেট এবং দ্রুততম ডেটা স্থানান্তরে বিপ্লব ঘটাবে।
তবে এই প্রযুক্তিগত হাইপ বা অতি-প্রচারণা নিয়ে সন্দিহান জাপানি বহুজাতিক বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান সফটব্যাংকের সিইও মাসায়োশি সন। প্রযুক্তি খাতে বড় বড় ও ঝুঁকিপূর্ণ বিনিয়োগের জন্য পরিচিত সন মনে করেন, মহাকাশে ডেটা সেন্টার পরিচালনার বিষয়টি শুনতে আকর্ষণীয় হলেও বাস্তবে এটি অত্যন্ত জটিল এবং ঝুঁকিপূর্ণ। শুধু সনই নন, মহাকাশ গবেষক এবং ক্লাউড কম্পিউটিং খাতের শীর্ষ বিশ্লেষকরাও এই ধারণার কার্যকারিতা নিয়ে একাধিক গুরুতর প্রশ্ন তুলেছেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, মহাকাশে ডেটা সেন্টার স্থাপনের ক্ষেত্রে প্রধান অন্তরায় হলো তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ বা কুলিং সিস্টেম। পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে ডেটা সেন্টারগুলো ঠান্ডা রাখার জন্য পানি বা বাতাস ব্যবহার করা হয়। কিন্তু মহাকাশের শূন্যতায় (ভ্যাকুয়াম) তাপ নির্গমন অত্যন্ত কঠিন একটি প্রক্রিয়া। ফলে সার্ভারগুলো অতিরিক্ত গরম হয়ে বিকল হওয়ার আশঙ্কা প্রবল। এছাড়া মহাকাশের ক্ষতিকর মহাজাগতিক বিকিরণ (কসমিক রেডিয়েশন) সংবেদনশীল কম্পিউটার চিপ ও হার্ডওয়্যার ধ্বংস করে দিতে পারে।
আরেকটি বড় উদ্বেগ হলো মহাকাশ বর্জ্য বা স্পেস ডেবরি। কক্ষপথে হাজার হাজার সক্রিয় ও নিষ্ক্রিয় স্যাটেলাইটের ভিড়ে ডেটা সেন্টারের মতো বিশাল কাঠামো স্থাপন করা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। কোনো ক্ষুদ্র ধ্বংসাবশেষের আঘাতও পুরো ডেটা সেন্টারকে মুহূর্তে ধ্বংস করে দিতে পারে। পাশাপাশি, মহাকাশে কোনো যন্ত্রাংশ নষ্ট হলে তা মেরামত বা প্রতিস্থাপন করার খরচ পৃথিবীর তুলনায় কয়েকশ গুণ বেশি, যা অর্থনৈতিকভাবে কোনোভাবেই লাভজনক নয়।
প্রযুক্তি বিশ্লেষকদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তন এবং ক্রমবর্ধমান বিদ্যুতের চাহিদা মেটাতে পৃথিবীতেই যখন পরিবেশবান্ধব ও সাশ্রয়ী ডেটা সেন্টার (যেমন সমুদ্রের তলদেশে ডেটা সেন্টার) তৈরির গবেষণা চলছে, তখন মহাকাশে ডেটা সেন্টার স্থাপনের পরিকল্পনা কেবলই একটি অবাস্তব প্রচারণা বা ‘হাইপ’ ছাড়া আর কিছুই নয়। ইলন মাস্কের এই মহাকাশ স্বপ্ন শেষ পর্যন্ত বাস্তবে রূপ নেবে, নাকি এটি কেবলই কল্পবিজ্ঞান হয়ে থাকবে, তা সময়ই বলে দেবে।
দেশনেত্র দৃষ্টি ছাড়িয়ে