মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘদিনের অস্থিরতা কাটিয়ে শান্তি ফেরার যে সাময়িক আশা জেগেছিল, তা আবারও বড় ধরনের ধাক্কা খেল। কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালীতে একটি তেলবাহী ট্যাঙ্কারে ড্রোন হামলার পর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে শুরু হয়েছে তীব্র সামরিক উত্তেজনা। শান্তি চুক্তি স্বাক্ষরের পর এটিকে দুই দেশের মধ্যে সবচেয়ে বড় এবং ভয়াবহ সংঘাত হিসেবে দেখছেন আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা। এই ঘটনা পুরো অঞ্চলের ভূ-রাজনীতিকে আবারও উত্তপ্ত করে তুলেছে।
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম রয়টার্স ও ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের প্রতিবেদন অনুযায়ী, সম্প্রতি হরমুজ প্রণালীতে একটি বাণিজ্যিক কার্গো জাহাজে ড্রোন হামলা চালানো হয়, যার পেছনে ইরানের হাত রয়েছে বলে দাবি করেছে মার্কিন প্রশাসন। এই হামলার পরপরই মার্কিন সামরিক বাহিনী ইরানের অভ্যন্তরে বেশ কয়েকটি সামরিক লক্ষ্যবস্তু ও ড্রোন ঘাঁটিতে পাল্টা বিমান হামলা চালায়। এই পাল্টাপাল্টি হামলার ফলে অঞ্চলটিতে সম্প্রতি কার্যকর হওয়া যুদ্ধবিরতি চুক্তিটি এখন চরম হুমকির মুখে পড়েছে। মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তর পেন্টাগন জানিয়েছে, তাদের এই পদক্ষেপ ছিল সম্পূর্ণ আত্মরক্ষামূলক এবং আন্তর্জাতিক নৌ-রুটের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার স্বার্থে।
এদিকে, বাহরাইনে ইরানের ড্রোন হামলার ঘটনায় মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতি আরও জটিল রূপ নিয়েছে। সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ উপসাগরীয় দেশগুলো ইরানের এই ড্রোন হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়েছে। তারা এক যৌথ বিবৃতিতে সতর্ক করে বলেছে যে, ইরানের এই আগ্রাসী আচরণ চলমান দ্বিপাক্ষিক সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) এবং আঞ্চলিক শান্তি প্রক্রিয়াকে সম্পূর্ণ নস্যাৎ করতে পারে। উপসাগরীয় দেশগুলোর মতে, ইরানের এই ধরণের উস্কানিমূলক কর্মকাণ্ড আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা নষ্ট করার একটি পরিকল্পিত চেষ্টা।
হরমুজ প্রণালী বিশ্বের অন্যতম প্রধান এবং সংবেদনশীল জ্বালানি সরবরাহ রুট। বিশ্বজুড়ে ব্যবহৃত মোট জ্বালানি তেলের এক-পঞ্চমাংশ এই রুট দিয়েই পরিবাহিত হয়। ফলে, এই সংঘাতের জেরে পারস্য উপসাগরে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল ও নৌ-পরিবহন খাতের সদ্য শুরু হওয়া পুনরুদ্ধার প্রক্রিয়া মারাত্মকভাবে ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। আন্তর্জাতিক শিপিং অ্যাসোসিয়েশনগুলো ইতিমধ্যে তাদের জাহাজের নিরাপত্তা নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। অনেক জাহাজ কোম্পানি তাদের রুট পরিবর্তন করার কথা ভাবছে, যা বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম এবং পরিবহন ব্যয় এক ধাক্কায় অনেক বাড়িয়ে দিতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, মার্কিন ও ইরানি বাহিনীর এই মুখোমুখি অবস্থান কেবল একটি যুদ্ধবিরতি চুক্তিকেই চ্যালেঞ্জ করছে না, বরং সমগ্র মধ্যপ্রাচ্যকে এক অনিরাপদ এবং দীর্ঘমেয়াদী যুদ্ধের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। জাতিসংঘ এবং ইউরোপীয় ইউনিয়ন ইতিমধ্যেই উভয় পক্ষকে সর্বোচ্চ সংযম প্রদর্শনের আহ্বান জানিয়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে দ্রুত আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক তৎপরতা শুরু না হলে, এই সংঘাত বিশ্ব অর্থনীতি এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তার জন্য এক বিপর্যয়কর পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে।
দেশনেত্র দৃষ্টি ছাড়িয়ে