চিলির লা চাসকোনা: পাবলো নেরুদার কাব্যিক জীবন ও সমুদ্রপ্রীতির স্মারক

চিলির রাজধানী সান্তিয়াগোর সান ক্রিস্টোবাল পাহাড়ের পাদদেশে অবস্থিত নোবেলজয়ী কবি, কূটনীতিক ও রাজনীতিবিদ পাবলো নেরুদার ঐতিহাসিক বাড়ি ‘লা চাসকোনা’ কেবল একটি স্থাপত্যকর্ম নয়, বরং তাঁর বর্ণিল জীবন, গভীর সমুদ্রপ্রীতি এবং ব্যক্তিগত অনুভূতির এক জীবন্ত প্রতিচ্ছবি। সম্প্রতি এক ভ্রমণকারী এই বাড়ি পরিদর্শনে গিয়ে নেরুদার স্মৃতির সঙ্গে একাত্ম হওয়ার এক অনন্য অভিজ্ঞতা লাভ করেছেন, যা তাঁর ব্যক্তিগত ভ্রমণকাহিনিতে বিস্তারিতভাবে উঠে এসেছে।

নেরুদার বাসস্থানটি খুঁজে বের করা ছিল এক ছোটখাটো অভিযান। স্থানীয় হোস্টেল ম্যানেজার বারবারা, শহরের মেট্রো মানচিত্র এঁকে বিস্তারিতভাবে বুঝিয়ে দিয়েছিলেন কীভাবে দুটি মেট্রো লাইন ব্যবহার করে শহরের শেষ প্রান্তে অবস্থিত এই বাড়িতে পৌঁছানো যাবে। সান ক্রিস্টোবাল পাহাড়ের ঢালে শান্ত ও নিরিবিলি পরিবেশে অবস্থিত এই বাড়িটি নেরুদার তৃতীয় স্ত্রী মাতিলদা উরুতিয়ার জন্য কেনা হয়েছিল। মাতিলদার কোঁকড়ানো চুলের প্রতি ভালোবাসার নিদর্শনস্বরূপ নেরুদা বাড়িটির নাম দেন ‘লা চাসকোনা’, যার অর্থ ‘কোঁকড়ানো চুল’।

বাড়ির অভ্যন্তরে প্রবেশাধিকারের জন্য নিচতলায় টিকিট সংগ্রহ করতে হয়। দর্শনার্থীদের কক্ষের ভেতরে ছবি তুলতে কঠোরভাবে নিষেধ করা হয়। টিকিটের সঙ্গে একটি হালকা ওজনের অডিও ডিভাইস দেওয়া হয়, যা প্রতিটি প্রদর্শিত বস্তু বা ছবির পাশে থাকা নম্বরে চাপ দিলে সে সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য সরবরাহ করে। এই ব্যবস্থা দর্শনার্থীদের নেরুদার ব্যক্তিগত সংগ্রহ এবং বাড়ির প্রতিটি কোণার সঙ্গে নিবিড়ভাবে পরিচিত হওয়ার সুযোগ করে দেয়।

অভ্যর্থনা কক্ষ পেরিয়ে একটি ছোট সিঁড়ি দিয়ে উপরে উঠলে দেখা যায় পাশাপাশি তিনটি কক্ষ, যার একটি ছিল খাবার ঘর। কাঠের মেঝে এবং বিভিন্ন দেশ থেকে আনা খাবার ও সুরা পরিবেশনের বিশেষ পাত্র দেখে অনুমান করা যায়, নেরুদা অতিথিদের আপ্যায়ন করতে ভালোবাসতেন। কূটনীতিক হিসেবে পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে ভ্রমণকালে তিনি বিভিন্ন জিনিসপত্র সংগ্রহ করেছিলেন, যা তাঁর বাড়ির প্রতিটি কক্ষে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। ঘরের জানালাগুলোতে তাঁর স্ত্রী মাতিলদার নামের আদ্যক্ষরের সাংকেতিক চিহ্ন ব্যবহার করা হয়েছে, যা তাঁদের গভীর ভালোবাসার ইঙ্গিত দেয়।

পাশের কক্ষটি ছিল নেরুদার শোবার ঘর। এর বৃত্তাকার জানালাগুলো জাহাজের জানালার মতো তৈরি, যা তাঁর আজীবন সমুদ্রপ্রেমের স্মারক। শৈশবে পিতার সঙ্গে সমুদ্র দর্শনের পর থেকেই নেরুদা সমুদ্রের বিশাল ঢেউকে এক মহাবিশ্বের হৃৎস্পন্দন হিসেবে অনুভব করতেন। তাঁর কবিতায় বারবার সমুদ্র ফিরে এসেছে, নিজেকে তিনি ‘আর্মচেয়ার নাবিক’ হিসেবে দেখতেন। অনেকেই তাঁর এই বাড়িকে ‘সমুদ্রের মন্দির’ বলে আখ্যায়িত করেন। এই কক্ষের দেওয়ালে লাতিন চিত্রকর দিয়েগো রিভেরার আঁকা মাতিলদার একটি বিশেষ ছবি শোভা পাচ্ছে, যেখানে মাতিলদার দুটি মুখ কিন্তু একটি মাথা, এবং তাঁর কোঁকড়ানো চুলে নেরুদার মুখ ভেসে উঠেছে।

ঘরের আরেকটি দেওয়ালে শ্রীলঙ্কার সমুদ্রসৈকতে নেরুদার একটি ছোট ছবি দর্শকদের মনোযোগ আকর্ষণ করে। কূটনৈতিক জীবনে নেরুদা একসময় বার্মা (বর্তমান মিয়ানমার) এবং সিলনে (বর্তমান শ্রীলঙ্কা) চিলির দূতাবাসে কাজ করেছেন। শ্রীলঙ্কার কলম্বোর ওয়েলাওয়াতে সমুদ্রতীরবর্তী একটি কুটিরে তাঁর দিনযাপন সম্পর্কে তিনি লিখেছিলেন, সকালে উঠে সমুদ্রসৈকতে হেঁটে, উষ্ণ জলে সাঁতার কেটে তিনি চমৎকার মধ্যাহ্নভোজের জন্য বাড়ি ফিরতেন। এই ছবিটি যেন তাঁর শ্রীলঙ্কার দিনগুলোর কথাই স্মরণ করিয়ে দেয়।

বাড়ির বাইরে একটি সুন্দর উঠান রয়েছে, যেখানে হরেক রকম গাছের সমারোহ। দর্শনার্থীরা এখানে বসে বিশ্রাম নিতে পারেন। ঘরের ভেতরে ছবি তোলার নিষেধাজ্ঞা থাকলেও, উঠানে ছবি তোলার অনুমতি রয়েছে। তবে, ভ্রমণকারী তাঁর ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে জানান, সমাজতান্ত্রিক দেশগুলোর প্রতি তাঁর যে একটি ‘সন্দেহপ্রবণ’ মানসিকতা কাজ করেছে, তার ফলস্বরূপ তিনি উঠানেও ক্যামেরা ব্যবহারের ক্ষেত্রে এক অজানা আতঙ্কে ভুগছিলেন, এই ভেবে যে গোপন ক্যামেরা হয়তো তাঁর প্রতিটি পদক্ষেপ নজরদারি করছে।

উঠান থেকে আরেকটি সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠলে দেখা যায় একটি বার, যা বৃহৎ কাচ দিয়ে ঘেরা। এখানে নেরুদা তাঁর বন্ধুদের নিয়ে পানাহার করতেন। পাশের কক্ষে ভারত থেকে সংগৃহীত একটি কাপড়ের তৈরি হাতির মূর্তি দেখা যায়, যা অডিও ডিভাইসের মাধ্যমে জানা যায়। আরও উপরে উঠলে নেরুদার ব্যক্তিগত লাইব্রেরি কক্ষটি পাওয়া যায়। প্রাথমিকভাবে অল্প সংখ্যক বই দেখে বিস্মিত হলেও, অডিও ডিভাইস থেকে জানা যায়, নেরুদা তাঁর বেশিরভাগ বই বিশ্ববিদ্যালয়ে দান করে দিয়েছিলেন। বাকি সামান্য কিছু বই তাঁর তিনটি বাড়িতে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে।

পাবলো নেরুদার ‘লা চাসকোনা’ বাড়িটি কেবল একটি জাদুঘর নয়, এটি তাঁর কর্মময় জীবন, ব্যক্তিগত আবেগ এবং শিল্পসত্তার এক অকৃত্রিম প্রকাশ। এখানে প্রতিটি কোণায় তাঁর উপস্থিতি অনুভব করা যায়, যা দর্শনার্থীদের এক গভীর ও মর্মস্পর্শী অভিজ্ঞতার মুখোমুখি করে তোলে। শান্ত ও কোলাহলহীন এই পরিবেশে দাঁড়িয়ে একজন দর্শনার্থীর মনে স্বভাবতই প্রশ্ন জাগে, ‘নেরুদা, বাড়ি আছ?’

এছাড়াও

এম্পায়ার স্টেট বিল্ডিংয়ের শীর্ষে দুঃসাহসিক প্রস্তাব: প্রেম নিবেদনের পর গ্রেপ্তার দম্পতি

নিউইয়র্কের আইকনিক এম্পায়ার স্টেট বিল্ডিংয়ের চূড়ায় উঠে বিয়ের প্রস্তাব দেওয়ার মতো এক ঝুঁকিপূর্ণ ও রোমাঞ্চকর …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *