গাজীপুরের কাপাসিয়া উপজেলায় এ বছর কাঁঠালের বাম্পার ফলন হলেও কৃষকদের মুখে হাসি নেই, বরং তাদের চোখেমুখে এখন চরম হতাশা। ঐতিহ্যবাহী এই ফলের উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে গেলেও বিপণন সংকটের কারণে চাষিরা তাদের উৎপাদিত পণ্যের নামমাত্র দামও পাচ্ছেন না। ভাওরাইদ গ্রামের কৃষক মো. শাহজাহান স্থানীয় ঘাগটিয়াচালা বাজারে ১৩টি কাঁঠাল বিক্রি করে পেয়েছেন মাত্র ১০০ টাকা। এই অর্থ দিয়ে তিনি দুই কেজি পেঁয়াজ কিনে বাড়ি ফিরেছেন। অর্থাৎ, প্রতিটি কাঁঠালের গড় দাম পড়েছে মাত্র সাড়ে সাত টাকা। শুধু শাহজাহান নন, কফিল উদ্দিনের মতো অনেক চাষি দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করেও কাঁঠাল বিক্রি করতে হিমশিম খাচ্ছেন। অনেক বাগানে কাঁঠাল পচে নষ্ট হচ্ছে, কিন্তু পরিবহন ও পাইকারের অভাবে তা বাজারে নেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।
কাপাসিয়া উপজেলা কৃষি অফিসের তথ্য অনুযায়ী, চলতি মৌসুমে উপজেলায় ১ হাজার ৭৬০ হেক্টর জমিতে কাঁঠাল চাষ হয়েছে এবং উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৭৩ হাজার ৫২৪ টন। ২০২৫ সালে গাজীপুরের কাঁঠাল ভৌগোলিক নির্দেশক বা জিআই পণ্যের স্বীকৃতি পেলেও, বাজারে এই ফলের দরপতন চাষিদের জন্য গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছে। স্থানীয় কৃষকদের অভিযোগ, দেশের অন্যান্য অঞ্চল থেকে পাইকারদের আগমন এবার অনেক কম। পাইকারি ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, গত বছরের তুলনায় এবার কাঁঠালের ক্রয়মূল্য প্রায় অর্ধেক কমে গেছে। আগে যে কাঁঠাল ৬ হাজার টাকায় কেনা হতো, এবার তা ১ হাজার ৫০০ থেকে ৪ হাজার টাকায় নেমে এসেছে। প্রায় প্রতিটি বাড়িতে কাঁঠাল উৎপন্ন হওয়ায় স্থানীয় খুচরা বাজারও স্থবির হয়ে পড়েছে।
এই পরিস্থিতিকে কেবল মন্দা হিসেবে না দেখে একটি কাঠামোগত সংকট হিসেবে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা। লেখক ও শিক্ষক মিশকাত রাসেলের মতে, কাঁঠালের বহুমুখী ব্যবহার ও প্রক্রিয়াজাতকরণের অভাবই এই সংকটের মূল কারণ। সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় হিমাগার বা সংরক্ষণাগার তৈরি করা গেলে চাষিরা বছরের অন্য সময়েও ভালো দাম পেতে পারতেন। এছাড়া, কাঁঠাল বিদেশে রপ্তানির প্রক্রিয়া আরও গতিশীল করার পরামর্শ দিয়েছেন তিনি।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আউলিয়া খাতুন জানিয়েছেন, কাপাসিয়ার কাঁঠাল গুণগত মানের কারণে বিদেশে সমাদৃত। সম্প্রতি চীনা প্রতিনিধি দলের সঙ্গে কাঁঠাল রপ্তানি নিয়ে আলোচনা হয়েছে। সরকারিভাবে যদি সংরক্ষণের ব্যবস্থা ও আধুনিক প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্প গড়ে তোলা যায়, তবেই এই ঐতিহ্যবাহী ফলটি স্থানীয় কৃষকের অর্থনৈতিক মুক্তির পথ দেখাতে পারবে। বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের কৃষি ও বাণিজ্য সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলো যদি দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করে, তবেই এই উৎপাদনশীলতা কৃষকের জন্য আশীর্বাদ হয়ে উঠবে, নতুবা এই লোকসান কাঁঠালচাষিদের স্থায়ীভাবে নিরুৎসাহিত করে তুলবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
দেশনেত্র দৃষ্টি ছাড়িয়ে