জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির প্রভাবে দেশের বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বেড়েই চলেছে। গত সপ্তাহেও বিভিন্ন অপরিহার্য দ্রব্যের দামে উল্লম্ফন দেখা গেছে, যা সীমিত আয়ের মানুষের ক্রয়ক্ষমতাকে আরও সংকুচিত করে তুলেছে। বিশেষ করে ডাল, তেল, চিনি ও মুরগির মতো মৌলিক খাদ্যপণ্যের দাম অস্বাভাবিক হারে বৃদ্ধি পাওয়ায় সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় নাভিশ্বাস উঠেছে।
দেশের বৃহত্তম পাইকারি বাজার খাতুনগঞ্জে গত এক সপ্তাহে ডালের পাইকারি দাম মণপ্রতি ১১০-২০০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে, যা খুচরা বাজারে কেজিপ্রতি প্রায় ৫ টাকা বৃদ্ধির কারণ হয়েছে। খাতুনগঞ্জের ব্যবসায়ীরা জানান, ডালের চাহিদা স্বাভাবিক থাকা সত্ত্বেও আমদানিকারকদের কারসাজির কারণে দাম বাড়ছে। বৃহস্পতিবার খাতুনগঞ্জে কানাডিয়ান ও অস্ট্রেলিয়ান মসুর ডাল বিক্রি হয়েছে মণপ্রতি ৩,১০০ টাকায়, যা এক সপ্তাহ আগেও ছিল ২,৯৮৫ টাকা। এছাড়া, সাদা মটর ডাল মণপ্রতি ১৫০ টাকা বেড়ে ১,৫৩০ টাকায় এবং আমদানি করা ছোলা ২০০ টাকা বেড়ে ২,৪০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। পাইকারি ডাল ব্যবসায়ীরা বলছেন, বাজারে ডালের সরবরাহ পর্যাপ্ত। এরপরও কিছু আমদানিকারক আন্তর্জাতিক বাজারে বুকিং মূল্য বৃদ্ধির অজুহাত দেখিয়ে দাম বাড়াচ্ছেন। তবে পাইকারি ব্যবসায়ী আজিজুল হক জানান, গত সপ্তাহে আন্তর্জাতিক বাজারে শুধুমাত্র মসুর ডালের বুকিং মূল্য বেড়েছে, অন্যান্য ডালের দাম স্থিতিশীল রয়েছে। তিনি আরও উল্লেখ করেন, বর্তমানে বাজারে যে ডাল বিক্রি হচ্ছে, তা অন্তত এক-দুই মাস আগে কেনা। উচ্চ বুকিং মূল্যে আনা ডাল বাজারে পৌঁছাতে আরও দেড় মাস সময় লাগবে।
এদিকে, চট্টগ্রামের একজন ডাল আমদানিকারক আশুতোষ মহাজন দাবি করেছেন যে, আন্তর্জাতিক বাজারে সব ধরনের ডালের বুকিং মূল্যই বেড়েছে। এর পাশাপাশি ডলারের মূল্যবৃদ্ধি এবং জাহাজ ভাড়াও বেড়েছে, যা পণ্যের দাম বাড়ার অন্যতম কারণ। তবে চট্টগ্রাম ডাল ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক এস এম মহিউদ্দিন বলেন, বাজার কিছু অসাধু আমদানিকারকের হাতে জিম্মি হয়ে পড়েছে। তারা যখন খুশি দাম বাড়ায় বা কমায়। বাজার নিয়ন্ত্রণে প্রশাসনের কঠোর নজরদারি প্রয়োজন।
রাজধানীর বাজারগুলোতেও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দামে একই চিত্র দেখা গেছে। মগবাজারে পাঁচ লিটার সয়াবিন তেলের বোতল ৭৬০ টাকায় বিক্রি হয়েছে, যা গত সপ্তাহে ছিল ৭১০ টাকা। ২ কেজি আটার প্যাকেট ৫ টাকা বেড়ে ৭৫ টাকা, খোলা চিনি ৫ টাকা বেড়ে ৭৫ টাকা এবং ছোট দানার মসুর ডাল ১০ টাকা বেড়ে ১২০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। উল্লেখ্য, বাংলাদেশ সুগার রিফাইনার্স অ্যাসোসিয়েশন গত সেপ্টেম্বরে চিনির সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য কেজিপ্রতি ৭৫ টাকা নির্ধারণ করে দিলেও, এটি বর্তমানে ৮৫ থেকে ১১০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। প্রোটিনের অন্যতম উৎস মুরগি ও ডিমের দামও বেড়েছে। এক সপ্তাহ আগে ব্রয়লার মুরগি ১৭০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হলেও বর্তমানে তা ১৭৫-১৮০ টাকা। অথচ সেপ্টেম্বরে এই মুরগির দাম ছিল ১২০-১৩০ টাকা। ফার্মের মুরগির ডিম ডজনপ্রতি ৫ টাকা বেড়ে ১১৫-১২০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
জাহাঙ্গীর কবির নামের এক বেসরকারি চাকরিজীবী তার ভোগান্তির কথা জানিয়ে বলেন, “বেতন বাড়ছে না, কিন্তু জিনিসপত্রের দাম হু হু করে বাড়ছে। ছেলেমেয়ের পড়াশোনার খরচ আর পরিবারের চাহিদা মেটাতে হিমশিম খাচ্ছি। সরকারের অবিলম্বে বাজার নিয়ন্ত্রণে পদক্ষেপ নেওয়া উচিত।” রাজধানীর কারওয়ান বাজারে ক্রেতা মো. খোরশেদ আলম জানান, তিনি ১০০ টাকা কেজি দরে গাজর কিনেছেন। নয় দিন আগে যে কুমড়া ৪০ টাকায় ছিল, এখন তা ৭০ টাকা। দুই মাস আগে খোলা সয়াবিন তেল ৭০ টাকা লিটারে বিক্রি হলেও এখন তা ১৫২ টাকা। তিনি বলেন, “১০ সদস্যের পরিবার চালাতে আমার ২৫,০০০ টাকা প্রয়োজন, কিন্তু এখন ৩৫,০০০ টাকা খরচ হচ্ছে। বেতন না বাড়ায় পরিবার চালাতে ঋণ করা ছাড়া আমার আর কোনো উপায় নেই।” শুক্রবার ঢাকার কাঁঠাল বাগান, কারওয়ান বাজার, নয়াতলা বউ বাজারসহ বিভিন্ন বাজারে শিম ৮০ টাকা, কাঁচা মরিচ ১০০ টাকা, লম্বা বেগুন ৬০ টাকা, গোল বেগুন ৭০ টাকা, টমেটো ১৪০ টাকা, ফুলকপি ৪০-৫০ টাকা প্রতি পিস এবং আলু ২৫ টাকা কেজি দরে বিক্রি হয়েছে।
কনজ্যুমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব) এর সভাপতি গোলাম রহমান বলেন, বাজারে শীতকালীন সবজি পুরোপুরি সহজলভ্য না হওয়া পর্যন্ত হয়তো এই পরিস্থিতি থেকে মুক্তি মিলবে না। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম স্থিতিশীল রাখতে সরকারকে বাজার সরবরাহ ব্যবস্থা উন্নত করতে হবে। আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়লে সরকার শুল্ক সমন্বয় বা সরকারি পর্যায়ে আমদানি করে পরিস্থিতি সামাল দিতে পারে। তিনি আরও বলেন, “আমরা এ বিষয়ে সরকারকে বারবার অনুরোধ জানালেও সরকার কার্যকর পদক্ষেপ নিচ্ছে না।”
দেশনেত্র দৃষ্টি ছাড়িয়ে