মুসলিম প্রতিষ্ঠানে কর্মী কি শুধুই ‘রিসোর্স’ নাকি আল্লাহর ‘আমানত’?

মুসলিম প্রতিষ্ঠানে কর্মী কি শুধুই ‘রিসোর্স’ নাকি আল্লাহর ‘আমানত’?

সাম্প্রতিক সময়ে মুসলিম মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানগুলোতে তাদের কর্মীদের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি এবং সামগ্রিক ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি নিয়ে একটি গভীর প্রশ্ন উত্থাপিত হয়েছে। যদিও অনেক প্রতিষ্ঠানে বাহ্যিকভাবে ইসলামী মূল্যবোধের কিছু প্রতীক যেমন নামাজঘর, আযানের ধ্বনি বা কোরআন তেলাওয়াত দেখা যায়, তবে এর গভীরে প্রবেশ করলে দেখা যায় যে, সময় বিন্যাস, ভাষার ব্যবহার, ব্যবস্থাপনার রীতি এবং সাফল্যের সংজ্ঞা— সবকিছুই ধার করা এমন এক মডেল থেকে, যা সম্পূর্ণ ভিন্ন বিশ্বদৃষ্টির মানুষের দ্বারা তৈরি। এই প্রেক্ষাপটে প্রশ্ন উঠেছে, একটি প্রতিষ্ঠানের কর্মী কি শুধুই একটি ‘রিসোর্স’ (সম্পদ) নাকি আল্লাহর পক্ষ থেকে অর্পিত এক ‘আমানত’ (বিশ্বাস)?

অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায়, এমনকি ৯০ শতাংশ মুসলিম কর্মী থাকা সত্ত্বেও একটি মুসলিম মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানে ধর্মীয় মূল্যবোধের কোনো গভীর ছাপ থাকে না। এই সমস্যাটি নিহিত রয়েছে ব্যবস্থাপনার অন্তর্নিহিত কাঠামোতে। কোনো ব্যবস্থাপনা কাঠামোই আসলে নিরপেক্ষ নয়; এর পেছনে তার নির্মাতার একটি সুনির্দিষ্ট বিশ্বাস লুকিয়ে থাকে। এই বিশ্বাস কি মানুষকে আল্লাহর সম্মানিত বান্দা হিসেবে দেখে, নাকি স্প্রেডশিটের একটি সংখ্যা বা নিছকই একটি ‘রিসোর্স’ হিসেবে বিবেচনা করে? ‘হিউম্যান রিসোর্স’ শব্দটি আমরা অবলীলায় ব্যবহার করলেও, যে মানুষকে আল্লাহ তাঁর নিজস্ব রুহ ফুঁকে সম্মানিত করেছেন, তাকে একটি সাধারণ ‘রিসোর্স’-এ নামিয়ে আনা কি নৈতিকভাবে সঙ্গত?

এই পরিস্থিতির একটি ঐতিহাসিক ব্যাখ্যাও বিদ্যমান। ওসমানিয়া সাম্রাজ্যের শেষ দিকে ইউরোপীয় অগ্রগতির সঙ্গে তাল মেলানোর তাড়নায় মুসলিম সমাজ ধীরে ধীরে আল্লাহ-ভরসা এবং অল্পেতুষ্টির মতো গুণগুলোকে ‘অলসতা’ ভাবতে শুরু করে। এর পরিবর্তে উৎপাদনশীলতাকেই নতুন মানদণ্ড হিসেবে গ্রহণ করা হয়। মেলিস হাফেজের ‘ইনভেন্টিং লেজিনেস’ (কেমব্রিজ ইউনিভার্সিটি প্রেস, ২০২১) গ্রন্থে এই ঐতিহাসিক পরিবর্তনের ধারা বিস্তারিতভাবে তুলে ধরা হয়েছে। সেই ধারা আজও অব্যাহত। মুসলিম বিশ্বের অনেক নেতা পাশ্চাত্যের বিজনেস স্কুল থেকে ডিগ্রি নিয়ে এসে নিউইয়র্কের ব্যবসায়িক মডেলগুলো কোনো রকম নিজস্ব ‘ফিল্টার’ ছাড়াই নিজেদের প্রতিষ্ঠানে প্রয়োগ করছেন।

সমস্যাটি পশ্চিম থেকে জ্ঞান অর্জনের মধ্যে নয়, বরং শেখার সময় নিজস্ব ইসলামী ‘ফিল্টার’ ব্যবহার না করার মধ্যে। ইসলামে প্রজ্ঞাকে মুমিনের হারানো সম্পদ বলা হয়েছে, যা যেখানেই পাওয়া যাক তা গ্রহণ করার কথা বলা আছে। সোনালি যুগের মুসলিম মনীষীরা গ্রিক জ্ঞানকে কেবল অনুবাদ করেননি, বরং তাকে বিশ্লেষণ করে তাওহিদি কাঠামোয় নতুন রূপ দিয়েছিলেন। আজকের দিনেও আমাদের সকাল ৯টা-৫টার কর্মঘণ্টা মূলত শিল্পবিপ্লব-যুগের একটি ইউরোপীয় মডেল; অথচ একজন মুসলিমের দৈনন্দিন জীবন পাঁচ ওয়াক্ত নামাজকে কেন্দ্র করেই আবর্তিত হয়। এই মৌলিক পার্থক্যকে উপেক্ষা করা ব্যবস্থাপনার ইসলামী দৃষ্টিভঙ্গির পরিপন্থী।

কর্মীকে ‘রিসোর্স’ না ভেবে আল্লাহর দেওয়া ‘আমানত’ হিসেবে দেখলে নিয়োগ, ছাঁটাই এবং সুযোগ-সুবিধার পুরো নীতিই সম্পূর্ণ বদলে যায়। তখন প্রতিষ্ঠান কেবল মুনাফার জায়গা না থেকে মানুষের রিজিক উপার্জনের একটি মাধ্যম হয়ে ওঠে, যার হিসাব একদিন আল্লাহকে দিতে হবে। একটি ইসলামী ব্যবস্থাপনা কাঠামো কেমন হতে পারে, তার কিছু দিক নিম্নরূপ হতে পারে:
* কর্মঘণ্টা এমনভাবে সাজানো যেন তা নামাজের সময়কে বিঘ্নিত না করে।
* কেবল মুনাফার চেয়ে ‘বারাকাহ’ (আল্লাহর পক্ষ থেকে বরকত) কে বেশি গুরুত্ব দেওয়া।
* নেতৃত্বকে শাসনের পরিবর্তে সেবা হিসেবে দেখা।
* কর্মীর আত্মিক যত্নকে প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বের অংশ করা।
* গ্রাহকের সঙ্গে কৌশল নয়, সততা ও ন্যায়পরায়ণতা দিয়ে লেনদেন করা।

এই ধরনের পরিবর্তন অর্জন করা অসম্ভব নয়; এর জন্য প্রয়োজন একটি সচেতন সিদ্ধান্ত—অন্য কারও মডেল ধার না করে নিজেদের বিশ্বাস থেকেই একটি স্বতন্ত্র কাঠামো গড়ে তোলা। এই রূপান্তর কেবল কোনো একক প্রতিষ্ঠান বা পরামর্শকের কাজ নয়। আলেম, গবেষক, উদ্যোক্তা এবং তরুণ শিক্ষার্থীদের একসঙ্গে বসে এই বিষয়ে গভীরভাবে ভাবতে হবে। ব্যবসা, অর্থ এবং সময়কে আল্লাহকেন্দ্রিক করে সাজালে একটি প্রতিষ্ঠান দুনিয়াতেও সফল হয় এবং পরকালেও মিজানের পাল্লা ভারী করে। আল্লাহ আমাদের এই পথে চলার তাওফিক দিন।

এছাড়াও

হরমুজ পাড়ি দিয়ে বাংলাদেশের পথে বিশাল ক্রুড তেলবাহী জাহাজ ‘নর্ডিক পোলক্স’: জ্বালানি নিরাপত্তায় নতুন দিগন্ত

হরমুজ পাড়ি দিয়ে বাংলাদেশের পথে বিশাল ক্রুড তেলবাহী জাহাজ ‘নর্ডিক পোলক্স’: জ্বালানি নিরাপত্তায় নতুন দিগন্ত

ঢাকা, [আজকের তারিখ]: মধ্যপ্রাচ্যের কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালী সফলভাবে পাড়ি দিয়ে বাংলাদেশের দিকে এগিয়ে আসছে …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *