সম্প্রতি বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তে মাদকদ্রব্য উদ্ধারের ঘটনা আশঙ্কাজনক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে, যা দেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও সংশ্লিষ্ট মহলে গভীর উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। বিশেষ করে ইয়াবা ও ক্রিস্টাল মেথ (আইস)-এর মতো উচ্চমূল্যের মাদকের চালান ধরা পড়ার পরিমাণ গত কয়েক মাসে উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। প্রশ্ন উঠেছে, কেন হঠাৎ করে এই সীমান্তে মাদকের চোরাচালান ও উদ্ধার কার্যক্রমে এমন উল্লম্ফন? এর পেছনের কারণগুলো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, প্রতিবেশী মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা এবং চোরাকারবারিদের নিত্যনতুন কৌশল এই পরিস্থিতির জন্য অনেকাংশে দায়ী।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মিয়ানমারের চলমান রাজনৈতিক ও সামরিক সংঘাত মাদক চোরাচালান বৃদ্ধির অন্যতম প্রধান কারণ। দেশটির শান প্রদেশ এবং গোল্ডেন ট্রায়াঙ্গল হিসেবে পরিচিত অঞ্চলগুলো দীর্ঘকাল ধরে মাদক উৎপাদনের কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত। সামরিক জান্তা ও বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীভিত্তিক সশস্ত্র বাহিনীর মধ্যে চলমান সংঘর্ষের কারণে সীমান্ত এলাকায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ভেঙে পড়েছে। এতে মাদক উৎপাদনকারী সিন্ডিকেটগুলো আরও সক্রিয় হয়ে উঠেছে এবং নির্বিঘ্নে মাদকদ্রব্য উৎপাদন ও পাচার করতে পারছে। এই অস্থিতিশীল পরিস্থিতি মাদক কারবারিদের জন্য নিরাপদ করিডোর তৈরি করেছে, যা তারা বাংলাদেশের দিকে মাদক ঠেলে দিতে ব্যবহার করছে।
এছাড়াও, সীমান্তবর্তী এলাকার মানুষের দারিদ্র্য এবং সহজে অর্থ উপার্জনের প্রলোভনও মাদক চোরাচালানে ভূমিকা রাখছে। চোরাকারবারিরা স্থানীয়দের দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে তাদের এই অবৈধ কর্মকাণ্ডে ব্যবহার করছে। মাদক পাচারের জন্য স্থলপথের পাশাপাশি নদীপথ, বিশেষ করে নাফ নদীকে ব্যবহার করা হচ্ছে। রাতের আঁধারে ছোট নৌকায় করে মিয়ানমার থেকে এসব মাদক বাংলাদেশে প্রবেশ করছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, মাদকের চালানগুলো কক্সবাজারের টেকনাফ, উখিয়া এবং বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি সীমান্ত দিয়ে সবচেয়ে বেশি প্রবেশ করছে। এসব এলাকায় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর কঠোর নজরদারি সত্ত্বেও দুর্গম পাহাড় ও নদীপথের সুবিধা নিয়ে কারবারিরা তাদের অপতৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছে।
বাংলাদেশি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, বিশেষ করে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি), র্যাব, পুলিশ এবং কোস্ট গার্ড মাদকের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করেছে। তাদের নিয়মিত অভিযানে বিপুল পরিমাণ মাদক উদ্ধার হচ্ছে এবং অনেক চোরাকারবারি ধরা পড়ছে। গত এক বছরে সীমান্ত থেকে কয়েকশ কোটি টাকা মূল্যের ইয়াবা ও আইস উদ্ধার করা হয়েছে। তবে, মিয়ানমারের পক্ষ থেকে কার্যকর কোনো পদক্ষেপের অভাব এবং সীমান্ত সুরক্ষায় তাদের দুর্বলতা বাংলাদেশের মাদকবিরোধী অভিযানকে আরও চ্যালেঞ্জিং করে তুলেছে। আন্তর্জাতিক মাদক চোরাচালান চক্রগুলোর সঙ্গে স্থানীয় অপরাধীদের যোগসাজশও এই সমস্যাকে আরও জটিল করে তুলছে।
মাদকের এই ভয়াবহ আগ্রাসন শুধু আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নয়, দেশের তরুণ সমাজকেও ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিচ্ছে। ইয়াবা ও আইসের মতো মাদকের সহজলভ্যতা যুবকদের মধ্যে আসক্তি বাড়াচ্ছে, যা সামাজিক অবক্ষয় ঘটাচ্ছে। এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় বাংলাদেশ সরকার বহুমুখী পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। সীমান্তজুড়ে নজরদারি বাড়ানো, প্রযুক্তিগত সহায়তা ব্যবহার করা, গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ জোরদার করা এবং মাদকবিরোধী জনসচেতনতা বৃদ্ধির ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে। তবে, এই সমস্যার টেকসই সমাধানের জন্য মিয়ানমারের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক আলোচনা এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সহযোগিতা অপরিহার্য। যতক্ষণ না মিয়ানমারের অভ্যন্তরে মাদকের উৎস বন্ধ হচ্ছে, ততক্ষণ পর্যন্ত এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করা বাংলাদেশের জন্য কঠিন হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা।
দেশনেত্র দৃষ্টি ছাড়িয়ে