মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জানিয়েছে যে, তারা ইয়েমেনে ইরান-সমর্থিত হুথি বিদ্রোহীদের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন মজুদের স্থাপনা এবং উপকূলীয় রাডার অবস্থানে হামলা চালিয়েছে। লোহিত সাগরে বাণিজ্যিক জাহাজের উপর হুথিদের ক্রমবর্ধমান হামলার প্রতিক্রিয়ায় এই সামরিক পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। এই হামলা মধ্যপ্রাচ্যে, বিশেষ করে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ লোহিত সাগরে, চলমান উত্তেজনাকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। আন্তর্জাতিক শিপিং লেন সুরক্ষিত রাখার এবং হুথিদের হামলার সক্ষমতা হ্রাস করার লক্ষ্যেই যুক্তরাষ্ট্র এই পদক্ষেপ নিয়েছে বলে সেন্টকমের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।
সাম্প্রতিক মাসগুলোতে লোহিত সাগর বিশ্বের অন্যতম বিপজ্জনক নৌপথ হয়ে উঠেছে। ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীরা, যারা ইরানের সমর্থনপুষ্ট, ইসরায়েল-হামাস সংঘাতের জেরে ফিলিস্তিনিদের প্রতি সংহতি প্রকাশ করে এই অঞ্চলের বাণিজ্যিক জাহাজগুলোর উপর ধারাবাহিক হামলা চালিয়ে আসছে। তাদের দাবি, ইসরায়েলগামী বা ইসরায়েলের সাথে সম্পর্কিত জাহাজগুলোই তাদের লক্ষ্য। তবে, বাস্তবে অনেক সময় সম্পর্কহীন জাহাজও হামলার শিকার হয়েছে। এসব হামলায় ড্রোন, ক্ষেপণাস্ত্র এবং দ্রুতগতির বোট ব্যবহার করা হচ্ছে, যা বিশ্ব বাণিজ্য এবং জ্বালানি সরবরাহে মারাত্মক বিঘ্ন ঘটাচ্ছে। অনেক শিপিং কোম্পানি তাদের জাহাজ লোহিত সাগরের পরিবর্তে আফ্রিকার দীর্ঘ পথ কেপ অফ গুড হোপ হয়ে ঘুরিয়ে নিতে বাধ্য হচ্ছে, যা পরিবহন খরচ ও সময় উভয়ই বাড়িয়ে দিচ্ছে।
মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ডের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, এবারের হামলায় হুথিদের গুরুত্বপূর্ণ সামরিক অবকাঠামো লক্ষ্য করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন মজুদের গুদাম, যা তাদের হামলা পরিচালনার জন্য অপরিহার্য। এছাড়াও, উপকূলীয় রাডার অবস্থানগুলোও হামলার শিকার হয়েছে, যা হুথিদের জাহাজ শনাক্তকরণ ও লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানার সক্ষমতা সীমিত করবে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা দপ্তরের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এই হামলাগুলো সুনির্দিষ্ট এবং আত্মরক্ষামূলক। এর উদ্দেশ্য হলো হুথিদের ভবিষ্যতের হামলা চালানোর ক্ষমতাকে দুর্বল করা এবং আন্তর্জাতিক শিপিংকে সুরক্ষিত রাখা। এর আগে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা লোহিত সাগরে ‘অপারেশন প্রসপারিটি গার্ডিয়ান’ নামে একটি বহুজাতিক নৌ মিশন চালু করেছিল, যা সত্ত্বেও হুথিদের হামলা থামেনি।
ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীরা দীর্ঘদিন ধরে ইরানের কাছ থেকে সামরিক ও আর্থিক সহায়তা পেয়ে আসছে। ইরান তাদের অস্ত্র, প্রশিক্ষণ এবং গোয়েন্দা তথ্য সরবরাহ করে বলে পশ্চিমা দেশগুলো অভিযোগ করে। যুক্তরাষ্ট্র এই হামলাগুলোকে লোহিত সাগরে ইরান-সমর্থিত প্রক্সি বাহিনীর কার্যকলাপের বিরুদ্ধে একটি পাল্টা জবাব হিসেবে দেখছে। মধ্যপ্রাচ্যে ইসরায়েল-হামাস যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে আঞ্চলিক উত্তেজনা চরমে পৌঁছেছে। লোহিত সাগরের এই সংঘাত একদিকে যেমন গাজায় ইসরায়েলের সামরিক অভিযানের সঙ্গে সম্পর্কিত, তেমনি এটি বৃহত্তর ইরান-ইসরায়েল/পশ্চিমা অক্ষের ছায়া যুদ্ধকেও প্রতিফলিত করে। এই হামলাগুলো আঞ্চলিক সংঘাতকে আরও বিস্তৃত করার ঝুঁকি তৈরি করছে এবং মধ্যপ্রাচ্যের স্থিতিশীলতাকে হুমকির মুখে ফেলছে।
মার্কিন হামলার পর হুথিরা পাল্টা প্রতিশোধমূলক হামলার হুমকি দিতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। আন্তর্জাতিক মহল এই পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। জাতিসংঘের মতো সংস্থাগুলো লোহিত সাগরে দ্রুত উত্তেজনা কমানোর আহ্বান জানিয়েছে, যাতে আন্তর্জাতিক আইন ও নৌচলাচলের স্বাধীনতা সুরক্ষিত থাকে। তবে, ওয়াশিংটন স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, তারা তাদের স্বার্থ এবং আঞ্চলিক মিত্রদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় সব পদক্ষেপ নিতে প্রস্তুত। এই সামরিক পদক্ষেপের ফলে বিশ্ব অর্থনীতিতে, বিশেষ করে জ্বালানি তেলের দামে কী প্রভাব পড়ে, তা দেখার জন্য সবাই অপেক্ষায় আছে। লোহিত সাগরে শান্তি ও স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে কূটনৈতিক প্রচেষ্টা এবং সামরিক চাপ উভয়ই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন।
দেশনেত্র দৃষ্টি ছাড়িয়ে