কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই (AI) প্রযুক্তির অভাবনীয় প্রসারে বিশ্বজুড়ে প্রযুক্তির নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হলেও, এর নেপথ্যে লুকিয়ে থাকা পরিবেশগত ঝুঁকি এখন বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে গুগল এবং অ্যামাজনের মতো বৈশ্বিক প্রযুক্তি জায়ান্টগুলোর জন্য তাদের নিজস্ব ‘নেট-জিরো’ বা কার্বন নিঃসরণ শূন্যে নামিয়ে আনার প্রতিশ্রুতি রক্ষা করা এখন বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মডেলগুলো প্রশিক্ষণের জন্য যে পরিমাণ বিদ্যুৎ ও শীতলীকরণ ব্যবস্থার প্রয়োজন হয়, তা পরিবেশের ওপর প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি করছে।
সাধারণত এআই মডেলগুলো পরিচালনার জন্য বিশাল ডেটাসেন্টারের প্রয়োজন হয়। এই ডেটাসেন্টারগুলো ২৪ ঘণ্টা সচল রাখতে প্রচুর বিদ্যুতের প্রয়োজন, যার বড় একটি অংশ এখনো জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে আসে। এছাড়া এআই সার্ভারের উচ্চ তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে যে পরিমাণ জলীয় সম্পদ ও বিদ্যুৎ ব্যবহৃত হয়, তা টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার সঙ্গে সাংঘর্ষিক। গুগল এবং অ্যামাজন উভয়ই গত কয়েক বছরে তাদের কার্বন ফুটপ্রিন্ট কমানোর প্রতিশ্রুতি দিলেও, এআই খাতে বিনিয়োগ বাড়ানোর ফলে তাদের কার্বন নিঃসরণের পরিমাণ উল্টো বৃদ্ধি পেয়েছে। অ্যামাজন বর্তমানে বিশ্বের বৃহত্তম ক্লাউড পরিষেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান হিসেবে তাদের বিশাল অবকাঠামোকে পরিবেশবান্ধব করার চেষ্টা করছে, তবে এআই-এর চাহিদা মেটাতে গিয়ে তাদের বিদ্যুৎ ব্যবহারের হার নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে।
গুগলের সাম্প্রতিক পরিবেশগত প্রতিবেদন অনুযায়ী, তাদের মোট কার্বন নিঃসরণের হারে যে ঊর্ধ্বগতি দেখা যাচ্ছে, তার পেছনে এআই প্রযুক্তির ব্যাপক ব্যবহার সরাসরি দায়ী। প্রতিষ্ঠানটি তাদের ডেটাসেন্টারগুলোতে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানোর চেষ্টা করলেও, এআই-এর ক্রমবর্ধমান চাহিদার তুলনায় সেই গতি যথেষ্ট নয়। অন্যদিকে, অ্যামাজনও একই সংকটের মুখোমুখি। কোম্পানিটি ২০৪০ সালের মধ্যে নেট-জিরো লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের ঘোষণা দিলেও, এআই অবকাঠামোর জন্য প্রয়োজনীয় শক্তির যোগান দিতে তাদের নতুন করে কয়লা বা গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ প্রকল্পের ওপর নির্ভর করতে হতে পারে, যা তাদের দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনার পরিপন্থী।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এআই প্রযুক্তির উন্নয়নের এই ধারায় যদি জ্বালানি সাশ্রয়ী বা পরিবেশবান্ধব বিকল্প প্রযুক্তি উদ্ভাবন করা না যায়, তবে বিশ্বজুড়ে জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি আরও বাড়বে। প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো এখন তাদের এআই মডেলগুলোকে আরও দক্ষ বা ‘এনার্জি এফিসিয়েন্ট’ করার ওপর জোর দিচ্ছে। তবে প্রশ্ন থেকেই যায়, এই প্রযুক্তির দ্রুত বিকাশের দৌড়ে পরিবেশের মূল্য কতটা দিতে হবে? প্রযুক্তিখাত ও পরিবেশবাদী গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে এখন এই বিতর্কই মুখ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে যে, এআই-এর সুফল কি পরিবেশের ক্ষতির চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ, নাকি প্রযুক্তিগত উন্নয়নের পাশাপাশি পরিবেশ সুরক্ষাকেই অগ্রাধিকার দিতে হবে। গুগল এবং অ্যামাজনের এই পরিস্থিতি বিশ্বের অন্যান্য প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের জন্য একটি বড় সতর্কবার্তা হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা।
দেশনেত্র দৃষ্টি ছাড়িয়ে