আধুনিক নগরায়ণের চাকচিক্য ও কৃত্রিম জীবনযাত্রার আড়ালে প্রতিনিয়ত বিলীন হয়ে যাচ্ছে আমাদের শিকড় ও প্রকৃতি। সাম্প্রতিক সময়ে টাউনশিপ বা আবাসন প্রকল্পের নামে যেভাবে গভীর বনভূমি উজাড় করা হচ্ছে, তা কেবল পরিবেশের ভারসাম্যই নষ্ট করছে না, বরং আদিবাসী জনগোষ্ঠীর অস্তিত্বকেও সংকটের মুখে ঠেলে দিচ্ছে। পাহাড়ের বুক চিরে তৈরি হওয়া নতুন রাস্তা, রিসোর্ট আর বাণিজ্যিক স্থাপনাগুলো যেন মাটির স্বাভাবিক ছন্দকে রুদ্ধ করে দিচ্ছে। প্রকৃতি আজ তার আপন রূপ হারিয়ে এক যান্ত্রিক রূপান্তরের শিকার।
শহরের এই কৃত্রিমতা কেবল ভৌগোলিক পরিবর্তনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, এটি মানুষের মনস্তত্ত্বেও গভীর ক্ষত তৈরি করছে। কাজের সন্ধানে গ্রামে ফেলে আসা সেই ফসলের খেত, মাটির উঠান, লাউমাচা আর প্রিয়জনদের স্মৃতি নিয়ে মানুষ ছুটছে অজানা গন্তব্যে। শহরের ফুটপাতে, রিকশা বা ভ্যানের ওপর যাদের দিন কাটে, তাদের চোখেমুখে লেগে থাকে এক অব্যক্ত বিষণ্ণতা। তাদের কাছে শহর মানেই বেঁচে থাকার জন্য এক অন্তহীন যুদ্ধ। অথচ এই শহরের যান্ত্রিক কোলাহলে তাদের ফেলে আসা দেশ—অর্থাৎ তাদের শেকড়—ধীরে ধীরে স্মৃতির অতলে হারিয়ে যাচ্ছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বা স্টুডিওর কৃত্রিম সফলতার আড়ালে আমরা প্রায়ই ভুলে যাই প্রান্তিক মানুষের যন্ত্রণার কথা। তথাকথিত ‘হ্যাপেনিং’ বা ভাইরাল হওয়ার নেশায় মত্ত এই সময়ে দেয়ালের কষ্ট বা মানুষের হাহাকার আর কারো কানে পৌঁছায় না। অথচ প্রতিদিন ভোরে, স্টেশনের বস্তিতে বা ঘাটে যারা শ্রান্ত হয়ে ঘুমিয়ে পড়ে, তাদের জীবনের প্রতিটি বাঁকে মিশে আছে এক একটি দেশের গল্প। এই গল্পগুলো কোনো সফল ফটোগ্রাফ বা ভাইরাল গানের লিরিক নয়, বরং এটি বেঁচে থাকার এক করুণ দলিল।
পরিশেষে, নগরের এই ধূসর বাস্তবতায় আমরা কি আসলেই নতুন কোনো ঠিকানা খুঁজে পাচ্ছি? নাকি আমরা কেবল শিকড়হীন এক যাযাবর জাতিতে পরিণত হচ্ছি? প্রকৃতির বিনাশ এবং মানুষের এই উদ্বাস্তু জীবনের করুণ পরিণতি আমাদের নতুন করে ভাবতে বাধ্য করে। ইট-পাথরের এই নগরে, যেখানে দুপুরের রোদ রক্তজবার মতো ঝরে পড়ে, সেখানে মানুষের আবেগ আর স্মৃতির মূল্যটুকু অন্তত যেন হারিয়ে না যায়। প্রকৃতির ইশারা এবং মানুষের এই অমোঘ হাহাকারই আমাদের ভবিষ্যতের আয়না।
দেশনেত্র দৃষ্টি ছাড়িয়ে