আষাঢ়ের শেষ বিকেলে পশ্চিম আকাশে সূর্য ঢলে পড়লে গারো পাহাড়ের সবুজ ঢালগুলো এক মায়াবী রূপ ধারণ করে। পাহাড়ের বুক চিরে টুংটাং ঘণ্টার শব্দে যখন গরুর পাল নিচে নেমে আসে, তখন বোঝা যায় এক সফল কর্মদিবস শেষ করে ফিরছেন সীমান্তবর্তী খামারিরা। শেরপুরের ঝিনাইগাতী, শ্রীবরদী ও নালিতাবাড়ী উপজেলার পাহাড়ি এলাকাগুলোতে এখন গরু পালনকে কেন্দ্র করে এক নীরব অর্থনৈতিক বিপ্লব ঘটছে। পাহাড়ের সহজলভ্য প্রাকৃতিক ঘাস ও লতাপাতাকে কাজে লাগিয়ে দেশি জাতের গরু পালন করে শত শত পরিবার আজ স্বাবলম্বী হওয়ার স্বপ্ন দেখছে।
ঝিনাইগাতীর গান্দিগাঁও গ্রামের হেলাল মিয়ার মতো প্রায় দেড় শতাধিক খামারি এই পেশায় নিজেদের ভাগ্য বদলে ফেলেছেন। দীর্ঘ ২৩ বছর ধরে গরু পালনের অভিজ্ঞতা থেকে হেলাল মিয়া জানান, পাহাড়ে গরু পালনের প্রধান সুবিধা হলো খাদ্য খরচ প্রায় শূন্য। সকালে পাহাড়ে ছেড়ে দেওয়া গরুগুলো সারাদিন প্রাকৃতিক পুষ্টিগুণে বেড়ে ওঠে, আর সন্ধ্যায় নির্দিষ্ট সময়ে ফিরে আসে। এর ফলে বাছুর প্রতি ৪০-৫০ হাজার এবং বড় গরু ৭০-৮০ হাজার টাকায় বিক্রি করে খামারিরা পাচ্ছেন ভালো মুনাফা। এই আয়েই চলছে তাঁদের সংসার, সন্তানদের শিক্ষা এবং জীবনযাত্রার মানোন্নয়ন।
পাহাড়কেন্দ্রিক এই গরু পালন শুধু ব্যক্তিগত সাফল্য নয়, বরং পুরো সীমান্তবর্তী অঞ্চলের অর্থনীতিতে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। বাবেলাকোনা, হারিয়াকোনা, গজনী, বালিজুরি ও দাওধারা-কাটাবাড়িসহ প্রায় ১৫টিরও বেশি গ্রামে এখন গরু পালন একটি প্রধান পেশা হয়ে দাঁড়িয়েছে। অনেকের খামারে ৬০ থেকে ৭০টি পর্যন্ত গরু রয়েছে, যা স্থানীয় পর্যায়ে কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করছে। বাজারে দেশি গরুর মাংসের স্বাদ ও চাহিদাও বেশি হওয়ায় ক্রেতাদের কাছেও এই খামারিদের গরুগুলো বেশ সমাদৃত।
তবে এই সাফল্যের পথে কিছু চ্যালেঞ্জও রয়েছে। গজনীর কৃষক হেরুত মারাক জানান, পাহাড়ের বন্যহাতির উপদ্রব থেকে গরু রক্ষা করা সবসময়ই একটি বড় দুশ্চিন্তার বিষয়। এছাড়া বর্ষাকালে দুর্গম যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং দ্রুত ভেটেরিনারি বা চিকিৎসাসেবা না পাওয়া খামারিদের জন্য বড় বাধা। প্রাণিসম্পদ বিভাগ ও বন কর্মকর্তাদের মতে, যথাযথ উদ্যোগ ও সরকারি সহায়তা পেলে এই অঞ্চলটি ভবিষ্যতে গরু পালনের একটি বড় হাব হিসেবে গড়ে উঠতে পারে, যা জাতীয় অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
দেশনেত্র দৃষ্টি ছাড়িয়ে