রংপুর-ঢাকা মহাসড়কে মর্মান্তিক এক সড়ক দুর্ঘটনায় এক মাদ্রাসার সুপার নিহত হওয়ার পর তীব্র জনরোষের মুখে পড়ে একটি যাত্রীবাহী বাস। ক্ষুব্ধ জনতা মহাসড়ক অবরোধ করে বাসটিতে আগুন ধরিয়ে দেয়, যার ফলে ওই এলাকায় ব্যাপক বিশৃঙ্খলা ও যানজটের সৃষ্টি হয়। রবিবার সকাল ১০টার দিকে রংপুরের মডার্ন মোড় সংলগ্ন তুলা গবেষণাকেন্দ্রের কাছে এই হৃদয়বিদারক ঘটনা ঘটে। নিহত ব্যক্তির নাম আবুল কাশেম। তিনি রংপুর সদর উপজেলার জিয়াতপুকুর দাখিল মাদ্রাসার সুপার এবং নগরীর ধর্মদাস মিলনপাড়া জামে মসজিদের খতিব হিসেবে পরিচিত ছিলেন। তার গ্রামের বাড়ি মিঠাপুকুর উপজেলার ছড়ান বালুয়ায়।
পুলিশ এবং স্থানীয় প্রত্যক্ষদর্শীদের সূত্রে জানা গেছে, রংপুর থেকে ঢাকার উদ্দেশ্যে যাচ্ছিল আর এম স্পেশাল পরিবহনের একটি বাস। সকাল ৯টার দিকে বাসটি মডার্ন মোড়ে পেছনের দিকে ঘোরানোর চেষ্টা করছিল। ঠিক সেই মুহূর্তে বাসটি পেছনে থাকা পথচারী আবুল কাশেমকে চাপা দেয়। এতে ঘটনাস্থলেই তার মর্মান্তিক মৃত্যু হয়। এই দুর্ঘটনার খবর দ্রুত ছড়িয়ে পড়লে স্থানীয় লোকজন তাৎক্ষণিকভাবে বিক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন। তারা দ্রুত ঘটনাস্থলে জড়ো হয়ে ঘাতক বাসটিকে আটকে ফেলেন এবং রংপুর-ঢাকা মহাসড়ক অবরোধ করেন।
বিক্ষোভকারীরা নিহত আবুল কাশেমের জন্য ন্যায়বিচার এবং সড়কে নিরাপদ যাতায়াতের দাবিতে স্লোগান দিতে থাকেন। তাদের এই অবরোধের ফলে মহাসড়কের দুই পাশে শত শত যানবাহন আটকা পড়ে এবং তীব্র যানজটের সৃষ্টি হয়। এতে যাত্রীরা চরম ভোগান্তিতে পড়েন। সকাল ১০টার পর একপর্যায়ে পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। জনতা তাদের ক্ষোভ নিয়ন্ত্রণ করতে না পেরে আর এম স্পেশাল পরিবহনের বাসটিতে আগুন ধরিয়ে দেয়। খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনেন। এরপর পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা ঘটনাস্থলে যান এবং পরিস্থিতি শান্ত করার চেষ্টা করেন।
রংপুর মহানগর তাজহাট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) রফিকুল ইসলাম ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে জানান যে, নিহত আবুল কাশেমের মরদেহ তার পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। এ ঘটনায় ঘাতক বাসের চালক মর্তুজাকে ইতোমধ্যে গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং তার বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের প্রক্রিয়া চলছে। মামলা দায়েরের প্রস্তুতিও চলছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
বাংলাদেশে সড়ক দুর্ঘটনা একটি নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে, যা প্রতি বছর অসংখ্য মানুষের প্রাণ কেড়ে নিচ্ছে। চালকদের বেপরোয়া মনোভাব, ট্রাফিক আইন লঙ্ঘনের প্রবণতা, ত্রুটিপূর্ণ যানবাহন এবং সড়ক ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা এসব দুর্ঘটনার প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত। প্রায়শই দেখা যায়, এমন দুর্ঘটনার পর স্থানীয় জনতা ক্ষোভে ফেটে পড়ে এবং আইন নিজের হাতে তুলে নেয়। এর মূল কারণ হলো, তারা মনে করে যে, প্রচলিত বিচার ব্যবস্থায় দ্রুত ও কার্যকর সমাধান পাওয়া যায় না এবং অপরাধীরা সহজেই পার পেয়ে যায়। এই ধরনের জনরোষের ফলে একদিকে যেমন জানমালের ক্ষতি হয়, তেমনি আইনশৃঙ্খলার অবনতি ঘটে এবং সাধারণ মানুষের ভোগান্তি বাড়ে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, সড়ক দুর্ঘটনা রোধে এবং জনগণের আস্থা ফিরিয়ে আনতে কঠোর আইন প্রয়োগ, চালকদের উন্নত প্রশিক্ষণ, যানবাহনের নিয়মিত ফিটনেস পরীক্ষা এবং সড়ক নিরাপত্তা বিষয়ক জনসচেতনতা বৃদ্ধি অত্যন্ত জরুরি। একই সাথে, দুর্ঘটনার পর দ্রুত বিচার নিশ্চিত করা এবং ক্ষতিগ্রস্তদের যথাযথ ক্ষতিপূরণ প্রদানের ব্যবস্থা করা প্রয়োজন, যাতে জনতা আইন নিজের হাতে তুলে নিতে বাধ্য না হয়। এই ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে রংপুর-ঢাকা মহাসড়কে সৃষ্ট বিশৃঙ্খলা সামাল দিতে পুলিশ ও প্রশাসনের পক্ষ থেকে ব্যাপক তৎপরতা চালানো হয়। রাস্তা থেকে পোড়া বাসের অবশিষ্টাংশ সরিয়ে যান চলাচল স্বাভাবিক করতে কয়েক ঘণ্টা সময় লাগে। এই ধরনের ঘটনা প্রমাণ করে যে, সড়ক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং জনগণের মধ্যে ন্যায়বিচারের অনুভূতি জাগিয়ে তোলা বাংলাদেশের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ।
দেশনেত্র দৃষ্টি ছাড়িয়ে