রাজধানীর আজিমপুর সরকারি ছোটমণি নিবাসের বাসিন্দা আট মাস বয়সী শিশু মাহিরের নিথর দেহটি যখন ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের দেয়াল ঘেঁষে পড়ে ছিল, তখন তার কপালে শেষ চুমু দেওয়ার মতো কোনো স্বজন পাশে ছিল না। হাম ও হাম-পরবর্তী নানাবিধ জটিলতায় আক্রান্ত হয়ে বৃহস্পতিবার দিবাগত রাতে তেজগাঁওয়ের একটি বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যায় সে। এরপর শনিবার সকালে আঞ্জুমান মুফিদুল ইসলামের ব্যবস্থাপনায় জুরাইন কবরস্থানে বেওয়ারিশ হিসেবে দাফন করা হয় এই মাতৃহীন-পিতৃহীন শিশুটিকে। কাফনের কাপড় সরিয়ে শেষবারের মতো তার নিষ্পাপ মুখটি দেখার জন্যও কেউ উপস্থিত ছিল না। চিরতরে বিদায় নেওয়ার সময় তার সঙ্গী ছিল কেবল দাফনকারী সংস্থার প্রতিনিধিরা।
ছোটমণি নিবাসের নথিপত্র অনুযায়ী, জন্মের পর থেকেই মাহিরের শারীরিক গঠন স্বাভাবিক ছিল না; তার মাথাটি শরীরের তুলনায় বেশ বড় ছিল। গাজীপুরের কাশিমপুর থানা পুলিশ তাকে উদ্ধারের পর মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের নির্দেশে চলতি বছরের জানুয়ারি মাসে আজিমপুরের এই সরকারি আশ্রয়কেন্দ্রে পাঠানো হয়। দীর্ঘ সময় ধরে হাম, নিউমোনিয়া ও তীব্র শ্বাসকষ্টে ভোগার পর শেষ পর্যন্ত মৃত্যুর কাছে হার মানে সে। প্রথমে তাকে সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে দুই মাস চিকিৎসা দেওয়া হয়। এরপর শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে ঢাকা মেডিকেল এবং পরবর্তীতে তেজগাঁওয়ের কিউর স্পেশালাইজড হাসপাতালের বিশেষায়িত আইসিইউতে স্থানান্তর করা হয়েছিল। কিন্তু সব চেষ্টা ব্যর্থ করে দিয়ে সে না-ফেরার দেশে চলে যায়।
মাহিরের এই করুণ মৃত্যু কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। সমাজসেবা অধিদপ্তরের অধীন পরিচালিত এই আশ্রয়কেন্দ্রটিতে সম্প্রতি হামের মারাত্মক প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, হাম ও এর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ায় আক্রান্ত হয়ে গত কয়েক মাসে মাহিরসহ মোট পাঁচ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এর আগে খুশবু (৯ মাস), আরিশা (১ বছর), মুনা (৩ মাস ১৮ দিন) এবং মেহেদী (৫ মাস) নামের আরও চারজন নিস্পাপ শিশু একইভাবে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে। এদের প্রত্যেককেই শেষ পর্যন্ত আঞ্জুমান মুফিদুল ইসলামের সহায়তায় বেওয়ারিশ হিসেবে দাফন করা হয়েছে।
নিহত শিশুদের জীবনের গল্পগুলো অত্যন্ত বেদনাদায়ক। ৯ মাস বয়সী খুশবুর মা খুন হওয়ার পর তার বাবা কারাগারে যান। মাত্র ৪৫ দিন বয়সে তাকে আদালতের আদেশে ছোটমণি নিবাসে পাঠানো হয়েছিল। চিকিৎসাধীন অবস্থায় গত ৩১ মে সে মারা যায়। তার মৃত্যুসনদে বাবার নামের জায়গায় লেখা রয়েছে ‘ছোটমণি নিবাস’। অন্যদিকে, মানসিক ভারসাম্যহীন মায়ের গর্ভে জন্ম নেওয়া মুনা গত ২২ জুন মারা যায়। মাত্র এক দিন বয়সে রাস্তা থেকে উদ্ধার হওয়া অপুষ্ট শিশু মেহেদীও হামের ছোবল থেকে বাঁচতে পারেনি। আরিশা নামের আরেক শিশুকে রাজবাড়ী থেকে উদ্ধার করে এখানে আনা হয়েছিল, সেও নিউমোনিয়া ও হামে আক্রান্ত হয়ে প্রাণ হারায়।
আজিমপুর ছোটমণি নিবাসের উপতত্ত্বাবধায়ক তানজিনা আফরিন জানিয়েছেন, বর্তমানে এই নিবাসে ৩৮ জন শিশু রয়েছে। একটি সীমিত জায়গায় এতগুলো শিশু একসঙ্গে বসবাস করায় হামের মতো অত্যন্ত সংক্রামক রোগ ছড়িয়ে পড়া রোধ করা অত্যন্ত কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। শিশুরা কেবল হামেই নয়, চুলকানি (স্ক্যাবিস) সহ বিভিন্ন চর্মরোগ ও পুষ্টিহীনতায় ভুগছে। তিনি আরও জানান, প্রতিষ্ঠানটিতে তীব্র জনবল সংকট রয়েছে। পর্যাপ্ত আয়া ও চিকিৎসাসেবার অভাব সত্ত্বেও তারা শিশুদের রক্ষায় সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। কোনো শিশুর মৃত্যু হলে আইনি জটিলতা এড়াতে থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করা ও ময়নাতদন্ত ছাড়া লাশ হস্তান্তরের অনুমতি নেওয়ার মতো নানা আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হয়।
সমাজসেবা অধিদপ্তরের পরিচালক (পরিষ্ঠান) সমীর মল্লিক এ প্রসঙ্গে বলেন, হামের প্রাদুর্ভাব দেখা দেওয়ার পর থেকে আজিমপুর নিবাসের আক্রান্ত শিশুদের সর্বোচ্চ চিকিৎসা নিশ্চিত করার চেষ্টা করা হয়েছে। প্রায় ২০ জন শিশুকে বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি করে চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে এবং তাদের পুষ্টিকর খাবার সরবরাহ করা হচ্ছে। তবে তীব্র সীমাবদ্ধতা ও জনবল সংকটের কারণে সবাইকে বাঁচানো সম্ভব হয়নি। তবে আশার কথা হলো, বর্তমানে নতুন করে কোনো শিশু হামে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি নেই এবং দেশের অন্য পাঁচটি ছোটমণি নিবাসে এ ধরনের কোনো মৃত্যুর ঘটনা ঘটেনি। পিতৃ-মাতৃ পরিচয়হীন এসব অসহায় শিশুর জীবন সুরক্ষায় সরকারি সুযোগ-সুবিধা ও নজরদারি আরও বাড়ানো প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা।
দেশনেত্র দৃষ্টি ছাড়িয়ে