দেশের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার যুক্তরাষ্ট্র ও সিঙ্গাপুর থেকে মোট ২ লাখ ৭০ হাজার টন গম আমদানির অনুমোদন দিয়েছে। এই বিশাল পরিমাণ গম আমদানিতে মোট ব্যয় হবে ১ হাজার ৫২ কোটি ৪১ লাখ টাকা। তবে, এই আমদানির ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের গম সিঙ্গাপুরের গমের চেয়ে প্রতি টনে প্রায় ২৪ মার্কিন ডলার বা প্রায় ৩ হাজার টাকা বেশি দামে কেনা হচ্ছে, যা আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
বুধবার সচিবালয়ে অনুষ্ঠিত সরকারি ক্রয় সংক্রান্ত কমিটির বৈঠকে এই গম আমদানির প্রস্তাব অনুমোদন লাভ করে। অনুমোদিত পরিমাণ গমের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র থেকে আসবে ২ লাখ ২০ হাজার টন এবং সিঙ্গাপুর থেকে আমদানি করা হবে ৫০ হাজার টন। বিস্তারিত হিসাব অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র থেকে ২ লাখ ২০ হাজার টন গম আমদানিতে ব্যয় হবে ৮৬৯ কোটি ৫৬ লাখ টাকা, যেখানে প্রতি টনের মূল্য ধরা হয়েছে ৩২২ মার্কিন ডলার। অন্যদিকে, সিঙ্গাপুরের অ্যাগ্রোকর্প ইন্টারন্যাশনাল পিটিই লিমিটেড থেকে আন্তর্জাতিক উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে আমদানি করা ৫০ হাজার টন গমের জন্য ব্যয় হবে ১৮২ কোটি ৮৫ লাখ টাকা, যার প্রতি টনের দাম পড়বে ২৯৭.৯২ মার্কিন ডলার।
মার্কিন গম উচ্চমূল্যে কেনার কারণ হিসেবে অতীতে এর গুণগত মানকে উল্লেখ করা হয়েছিল। সংশ্লিষ্ট মহল থেকে জানা যায়, যুক্তরাষ্ট্রের গমের মান সাধারণত উন্নত হওয়ায় কিছুটা বেশি দাম পরিশোধ করতে হয়। তবে, এই মূল্য পার্থক্য সরকারের খাদ্য সংগ্রহ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলতে পারে। দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে যেখানে প্রতিটি ব্যয়ের দিকে সতর্ক দৃষ্টি রাখা জরুরি, সেখানে এই ধরনের উচ্চমূল্যের আমদানি সিদ্ধান্ত সাধারণ মানুষের মধ্যে কৌতূহল সৃষ্টি করেছে।
উল্লেখ্য, বাংলাদেশের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের গমের বাণিজ্য সম্পর্ক সাম্প্রতিক সময়ে উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। গত বছর জুলাই মাসে বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে গম আমদানির বিষয়ে একটি সমঝোতা স্মারক (MoU) স্বাক্ষরিত হয়। এই সমঝোতা স্মারকের পর চলতি বছরের জানুয়ারিতে বাংলাদেশে নিযুক্ত তৎকালীন মার্কিন রাষ্ট্রদূত ব্রেন্ট টি ক্রিস্টেনসেন বলেছিলেন যে, বাংলাদেশ এখন মার্কিন গমের অষ্টম বৃহত্তম বাজারে পরিণত হয়েছে, যেখানে এর আগে বাংলাদেশ শীর্ষ ২৫ বাজারের মধ্যেও ছিল না। এই তথ্য যুক্তরাষ্ট্রের সাথে বাংলাদেশের ক্রমবর্ধমান খাদ্য বাণিজ্য সম্পর্কের গুরুত্ব তুলে ধরে।
বৈশ্বিক খাদ্য বাজারের অস্থিরতা, বিশেষ করে ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাব এবং জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বিভিন্ন দেশে ফসলের উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে গমের দাম ওঠানামা করছে। এমন পরিস্থিতিতে, বাংলাদেশ তার খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিভিন্ন উৎস থেকে গম সংগ্রহে জোর দিচ্ছে। সরকারি-বেসরকারি উভয় পর্যায়েই খাদ্যশস্য আমদানির মাধ্যমে দেশের অভ্যন্তরীণ চাহিদা মেটানোর চেষ্টা চলছে। তবে, দামের ক্ষেত্রে যৌক্তিকতা এবং গুণগত মানের ভারসাম্য বজায় রাখা একটি বড় চ্যালেঞ্জ।
খাদ্য আমদানির পাশাপাশি, অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেও পদক্ষেপ নিয়েছে। একই বৈঠকে স্পট মার্কেট থেকে দুই কার্গো তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানির অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। সিঙ্গাপুরভিত্তিক বিপি সিঙ্গাপুর প্রাইভেট লিমিটেড থেকে এক কার্গো এবং যুক্তরাজ্যভিত্তিক টোটাল ইঞ্জিনিয়ারিং গ্যাস অ্যান্ড পাওয়ার লিমিটেড থেকে আরেক কার্গো এলএনজি কেনা হবে। এই দুই কার্গো এলএনজি আমদানিতে মোট ব্যয় হবে ১ হাজার ৪৩৭ কোটি ৫৫ লাখ টাকা। ক্রমবর্ধমান শিল্পায়ন ও বিদ্যুৎ উৎপাদন বৃদ্ধির জন্য এলএনজির চাহিদা অপরিহার্য, যা পূরণে সরকার দ্রুত পদক্ষেপ নিচ্ছে।
বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দেশ ও জনগণের খাদ্য ও জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বদ্ধপরিকর। বিশ্ব অর্থনীতির নানা চ্যালেঞ্জ ও বাজারের অস্থিরতা সত্ত্বেও অত্যাবশ্যকীয় পণ্যসমূহের সরবরাহ নির্বিঘ্ন রাখতে সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা চালানো হচ্ছে। তবে, প্রতিটি ক্রয় প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং সর্বোত্তম মূল্য নিশ্চিত করা জনস্বার্থে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
দেশনেত্র দৃষ্টি ছাড়িয়ে