দেশের সরকারি কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের জন্য বহুল প্রতীক্ষিত নবম পে-স্কেল বা নতুন বেতন কাঠামো ঘোষণা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে আলোচনা চলছে। ২০১৫ সালে অষ্টম পে-স্কেল বাস্তবায়নের পর প্রায় এক দশক পেরিয়ে গেলেও নতুন কোনো বেতন স্কেল ঘোষণা করা হয়নি। এর ফলে বর্তমান বাজার পরিস্থিতি এবং লাগামহীন মূল্যস্ফীতির কারণে সরকারি চাকুরিজীবীদের একটি বড় অংশ চরম অর্থনৈতিক সংকটের মুখোমুখি হচ্ছেন। বিশেষ করে নিম্ন ও মধ্যম সারির কর্মচারীদের জীবনযাত্রার ব্যয় মেটাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে নতুন পে-স্কেল ঘোষণার দাবিটি পুনরায় জোরালো হয়ে উঠেছে।
অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সাধারণত প্রতি পাঁচ বছর পর পর নতুন বেতন কাঠামো ঘোষণা করার একটি অনানুষ্ঠানিক রেওয়াজ রয়েছে। তবে ২০১৫ সালের পর দীর্ঘ সময় পার হলেও নতুন পে-স্কেল না আসায় কর্মচারীদের মধ্যে অসন্তোষ দানা বাঁধছে। বিগত সরকারের আমলে ৫ শতাংশ বিশেষ প্রণোদনা দেওয়া হলেও তা বর্তমান বাজারের উচ্চ মূল্যস্ফীতির তুলনায় অত্যন্ত অপ্রতুল বলে দাবি করছেন সংশ্লিষ্টরা। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম যেভাবে বেড়েছে, তাতে এই সামান্য বৃদ্ধি সাধারণ কর্মচারীদের জীবনে কোনো ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারেনি।
বর্তমানে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দেশের রাষ্ট্রীয় ও অর্থনৈতিক সংস্কারের ওপর সর্বোচ্চ জোর দিচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে সরকারি কর্মচারীদের বেতন বৃদ্ধির বিষয়টি সরকারের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। একদিকে যেমন সরকারি কোষাগারের ওপর অতিরিক্ত আর্থিক চাপ সামলানো প্রয়োজন, অন্যদিকে সাধারণ কর্মচারীদের জীবনযাত্রার মান নিশ্চিত করাও জরুরি। অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতি এবং রাজস্ব আয়ের বিষয়টি মাথায় রেখে বিষয়টি গভীরভাবে পর্যালোচনা করা হচ্ছে।
বিগত কয়েক বছরে দেশের সামষ্টিক অর্থনীতিতে নানামুখী সংকটের সৃষ্টি হয়েছে। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর চাপ, ব্যাংক খাতের সংস্কার এবং রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে ঘাটতি—সব মিলিয়ে সরকারের আর্থিক সক্ষমতা এখন কঠিন পরীক্ষার সম্মুখীন। এই অবস্থায় নতুন একটি পে-স্কেল বাস্তবায়ন করতে গেলে সরকারের ওপর যে বিশাল আর্থিক দায় তৈরি হবে, তা বহন করা বর্তমান বাজেটের পক্ষে কতটা সম্ভব, তা নিয়ে নীতি-নির্ধারকদের মধ্যে চুলচেরা বিশ্লেষণ চলছে। তা সত্ত্বেও, কর্মচারীদের পক্ষ থেকে দাবি করা হচ্ছে যে, জীবনযাত্রার ব্যয় যেভাবে বেড়েছে, তাতে বেতন পুনর্নির্ধারণ করা না হলে সরকারি দপ্তরে কাজের গতিশীলতা ও সততা বজায় রাখা কঠিন হয়ে পড়বে।
অর্থনীতিবিদরা মনে করেন, হঠাৎ করে একটি বড় বেতন স্কেল ঘোষণা করলে বাজারে মুদ্রা সরবরাহ বেড়ে গিয়ে মূল্যস্ফীতি আরও উসকে দিতে পারে। তাই বেতন সরাসরি বাড়ানোর চেয়ে মূল্যস্ফীতির সাথে সামঞ্জস্য রেখে স্বয়ংক্রিয়ভাবে বেতন সমন্বয়ের একটি স্থায়ী ব্যবস্থা গড়ে তোলা যেতে পারে। এতে করে প্রতি বছর বাজারের পরিস্থিতি অনুযায়ী কর্মচারীদের বেতন সমন্বয় হবে এবং তাদের জীবনযাত্রার মানও বজায় থাকবে। সরকারি চাকরিজীবী সমন্বয় পরিষদসহ বিভিন্ন সংগঠন ইতোমধ্যে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের কাছে নতুন পে-স্কেল গঠন এবং মহার্ঘ ভাতা প্রদানের দাবি জানিয়েছে। সরকারের পক্ষ থেকে এখনও চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্ত জানানো না হলেও, সংশ্লিষ্ট মহল আশা করছে যে দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে সরকার শিগগিরই একটি বাস্তবসম্মত ও কল্যাণমুখী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবে।
দেশনেত্র দৃষ্টি ছাড়িয়ে