উত্তর কোরিয়ার সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী কিম জং উন বিশ্ব রাজনীতির অন্যতম রহস্যময় চরিত্র। গত ১৫ বছর ধরে তিনি দেশটির শাসনভার নিজের হাতে রেখেছেন। তবে তাঁর ব্যক্তিগত জীবনের একটি অধ্যায় আজও উত্তর কোরিয়ার রাষ্ট্রযন্ত্র ও সাধারণ মানুষের কাছে পরম গোপনীয়। সেটি হলো তাঁর মা কো ইয়ং-হুইয়ের পরিচয়। রাষ্ট্রীয়ভাবে কিম জং উনের মা সম্পর্কে কোনো তথ্য বা প্রচারণা নেই, যা উত্তর কোরিয়ার মতো বংশানুক্রমিক শাসিত দেশে বেশ অস্বাভাবিক।
উত্তর কোরিয়ার রাজনৈতিক কাঠামোয় ‘পায়েকতু রক্তধারা’ বা কিম পরিবারের পবিত্র বংশমর্যাদাকে অত্যন্ত গুরুত্ব দেওয়া হয়। কিম জং উনের দাদা কিম ইল সুং ও বাবা কিম জং ইলের গুণগান গাইতে সরকারি প্রচারযন্ত্র কখনোই ক্লান্ত হয় না। অথচ, বর্তমান নেতার মায়ের নাম প্রকাশ্যে উচ্চারণ করা তো দূরের কথা, জনসম্মুখে তাঁর কোনো প্রতিকৃতি বা জীবনীও প্রকাশ করা হয়নি। বিশ্লেষকদের মতে, এর পেছনে রয়েছে গভীর রাজনৈতিক কৌশল। কো ইয়ং-হুই মূলত জাপানে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। উত্তর কোরিয়ার মতো দেশে, যেখানে জাপানবিরোধী জাতীয়তাবাদ রাষ্ট্রীয় আদর্শের অন্যতম ভিত্তি, সেখানে নেতার মায়ের জাপানি সংযোগ শাসকগোষ্ঠীর জন্য বড় ধরনের ভাবমূর্তির সংকট তৈরি করতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, কিম জং উনের ক্ষমতার বৈধতা টিকিয়ে রাখতে এই নীরবতা অপরিহার্য। যদি তাঁর মায়ের পরিচয় উন্মোচিত হয়, তবে উগ্র জাতীয়তাবাদী গোষ্ঠীগুলো কিমের বংশগত শুদ্ধতা নিয়ে প্রশ্ন তুলতে পারে। এছাড়া, কো ইয়ং-হুই ছিলেন কিম জং ইলের তৃতীয় স্ত্রী, যার ফলে পারিবারিক ক্ষমতার দ্বন্দ্বেও তাঁর মায়ের অবস্থান নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টির সুযোগ রয়েছে। তাই রাষ্ট্রীয়ভাবে এই পরিচয়কে ধামাচাপা দিয়ে কিম জং উন নিজেকে সরাসরি কিম ইল সুং-এর পবিত্র উত্তরাধিকারী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে চেয়েছেন।
কিম জং উনের এই নীরবতা কেবল ব্যক্তিগত গোপনীয়তা নয়, বরং এটি উত্তর কোরিয়ার টিকে থাকার কৌশলের অংশ। রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারকরা জানেন, নেতার ব্যক্তিগত জীবনের কোনো ‘ত্রুটি’ বা ‘অস্পষ্টতা’ যদি সাধারণ মানুষের সামনে আসে, তবে তা পুরো শাসনব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থা কমিয়ে দিতে পারে। তাই কিম জং উনের মায়ের পরিচয় আজও উত্তর কোরিয়ার সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় গোপন রহস্য হয়েই রয়ে গেছে, যা দেশটির কঠোর নিয়ন্ত্রিত প্রচার ব্যবস্থার এক অনন্য উদাহরণ।
দেশনেত্র দৃষ্টি ছাড়িয়ে