মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে দীর্ঘদিনের উত্তেজনা সম্প্রতি এক নতুন মাত্রা পেয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সম্প্রতি ঘোষণা করেছেন যে, ইরান ইস্যুতে যুদ্ধবিরতি শেষ হয়ে গেছে, তবে একইসাথে তিনি জানিয়েছেন যে যুক্তরাষ্ট্র আলোচনার ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে প্রস্তুত। এই দ্বিমুখী অবস্থান আন্তর্জাতিক মহলে মিশ্র প্রতিক্রিয়ার জন্ম দিয়েছে এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা নিয়ে উদ্বেগ বাড়িয়েছে।
গত কয়েকদিনে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ওপর পরপর দু’দিন বিমান হামলা চালিয়েছে, যা পরিস্থিতিকে তীব্র উত্তেজনার দিকে ঠেলে দিয়েছে। এসব হামলাকে মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক তৎপরতার স্পষ্ট ইঙ্গিত হিসেবে দেখা হচ্ছে। এর জবাবে তেহরানও বসে থাকেনি; তারা তিনটি উপসাগরীয় আরব রাষ্ট্রকে লক্ষ্য করে পাল্টা হামলা চালিয়েছে বলে খবর পাওয়া গেছে। এই পাল্টা হামলার ঘটনা আঞ্চলিক সংঘাতের ঝুঁকিকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে, যেখানে উপসাগরীয় দেশগুলো প্রায়শই ইরান ও তার আঞ্চলিক মিত্রদের সঙ্গে ছায়া যুদ্ধের অংশীদার।
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের এই অবস্থান যে, যুদ্ধবিরতি শেষ হয়ে গেলেও আলোচনার পথ খোলা, তা এক জটিল কূটনৈতিক পরিস্থিতি তৈরি করেছে। তিনি উল্লেখ করেছেন যে, ইরানের অনুরোধেই যুক্তরাষ্ট্র আলোচনা চালিয়ে যেতে রাজি হয়েছে। এই বক্তব্য থেকে বোঝা যায়, উভয় পক্ষই সামরিক সংঘাতের পাশাপাশি কূটনৈতিক সমাধান খুঁজছে, যদিও তাদের মধ্যে অবিশ্বাস ও শত্রুতা চরমে। ট্রাম্প প্রশাসন শুরু থেকেই ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি এবং আঞ্চলিক প্রভাব বিস্তারের প্রচেষ্টার তীব্র সমালোচনা করে আসছে, যার ফলে ২০১৫ সালের পারমাণবিক চুক্তি থেকে যুক্তরাষ্ট্র সরে আসে এবং ইরানের ওপর নতুন করে কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। এই নিষেধাজ্ঞাগুলো ইরানের অর্থনীতিতে ব্যাপক চাপ সৃষ্টি করেছে এবং উভয় দেশের মধ্যে উত্তেজনা আরও বাড়িয়েছে।
ইরানের দিক থেকে, তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি এবং ক্ষেপণাস্ত্র উন্নয়ন অব্যাহত রাখার ঘোষণা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের জন্য উদ্বেগের কারণ। তেহরান বরাবরই দাবি করে আসছে যে তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি শান্তিপূর্ণ উদ্দেশ্যে পরিচালিত এবং তাদের আঞ্চলিক সামরিক উপস্থিতি আত্মরক্ষামূলক। তবে, ইয়েমেন, সিরিয়া, ইরাক এবং লেবাননে ইরানের প্রভাব বিস্তারের প্রচেষ্টা মধ্যপ্রাচ্যের ক্ষমতার ভারসাম্যকে প্রভাবিত করছে এবং ইসরায়েল ও সৌদি আরবের মতো দেশগুলোর সঙ্গে ইরানের সম্পর্ককে আরও তিক্ত করে তুলছে।
এই পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়, বিশেষ করে ইউরোপীয় ইউনিয়ন, জাতিসংঘ এবং অন্যান্য আঞ্চলিক শক্তিগুলো উভয় পক্ষকে সংযম প্রদর্শনের আহ্বান জানিয়েছে। তারা একটি শান্তিপূর্ণ ও কূটনৈতিক সমাধানের উপর জোর দিয়েছে, যাতে মধ্যপ্রাচ্যে একটি বৃহত্তর সংঘাত এড়ানো যায়। তেলের বাজার থেকে শুরু করে বিশ্ব অর্থনীতি পর্যন্ত, এই সংঘাতের সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালীতে যেকোনো ধরনের সামরিক উত্তেজনা বিশ্বজুড়ে তেল সরবরাহে গুরুতর ব্যাঘাত ঘটাতে পারে।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ট্রাম্পের এই কৌশল একটি ‘চাপের মুখে আলোচনা’র কৌশল হতে পারে, যেখানে সামরিক শক্তি প্রদর্শনের মাধ্যমে ইরানকে আলোচনার টেবিলে বসতে বাধ্য করা হচ্ছে। অন্যদিকে, ইরানের পাল্টা হামলা তাদের সংকল্প এবং আঞ্চলিক সক্ষমতা প্রদর্শনের একটি উপায়। সামনের দিনগুলোতে এই দুই দেশের মধ্যে সম্পর্ক কোন দিকে মোড় নেয়, তা মধ্যপ্রাচ্যসহ বিশ্ব রাজনীতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হবে। উভয় পক্ষই যদি সংঘাতের পথ পরিহার করে গঠনমূলক আলোচনায় বসতে পারে, তবেই এই অঞ্চলের দীর্ঘমেয়াদী শান্তি ও স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।
দেশনেত্র দৃষ্টি ছাড়িয়ে