মার্কিন সুপ্রিম কোর্ট সম্প্রতি এক যুগান্তকারী রায়ে দেশের ফেডারেল আমলাতন্ত্রে রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা ও প্রভাবকে নতুন করে সংজ্ঞায়িত করেছে। এই রায়ে ফেডারেল রিজার্ভের একজন সদস্য, লিসা কুককে বরখাস্ত করার ক্ষেত্রে রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা সীমিত করা হয়েছে। তবে, একইসাথে আদালত অন্যান্য স্বাধীন সরকারি সংস্থার প্রধানদের বরখাস্ত করার ক্ষেত্রে রাষ্ট্রপতির ক্ষমতাকে উল্লেখযোগ্যভাবে প্রসারিত করেছে, যা পূর্ববর্তী আইনি নজিরকে বাতিল করে দিয়েছে। এই সিদ্ধান্ত ভবিষ্যতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রশাসনিক কাঠামো এবং ক্ষমতা বিভাজনের ওপর সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
ঐতিহাসিকভাবে, ফেডারেল সরকারে স্বাধীন সংস্থাগুলি একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। ফেডারেল ট্রেড কমিশন (FTC), সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (SEC), বা কনজিউমার ফিনান্সিয়াল প্রোটেকশন ব্যুরো (CFPB)-এর মতো সংস্থাগুলি রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ থেকে মুক্ত থেকে নিরপেক্ষভাবে কাজ করার জন্য ডিজাইন করা হয়েছিল। এদের প্রধানদের সাধারণত ‘ভালো কারণ’ (for-cause) ছাড়া অপসারণ করা যেত না, যার উদ্দেশ্য ছিল নির্বাহী শাখার অতিরিক্ত ক্ষমতা প্রয়োগ থেকে তাদের রক্ষা করা। এই ব্যবস্থাটি মার্কিন সংবিধানের ‘চেকস অ্যান্ড ব্যালেন্স’ নীতির একটি মূল স্তম্ভ হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছিল। পূর্ববর্তী আইনি নজির, যেমন ১৯৩৫ সালের ‘হামফ্রেস এক্সিকিউটর বনাম ইউনাইটেড স্টেটস’ মামলা, স্বাধীন সংস্থার প্রধানদের অপসারণের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রপতির ক্ষমতাকে সীমাবদ্ধ রেখেছিল।
সুপ্রিম কোর্টের এই নতুন রায় দুটি ভিন্ন দিকের ওপর আলোকপাত করেছে। প্রথমত, আদালত ফেডারেল রিজার্ভের ক্ষেত্রে তার স্বাধীনতা বজায় রেখেছে। রায়ে বলা হয়েছে যে, ফেডারেল রিজার্ভের বহুগাঠনিক নেতৃত্ব এবং দেশের মুদ্রানীতি নিয়ন্ত্রণের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার কারণে এর বোর্ড সদস্যদের অপসারণের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা সীমিত থাকবে। এটি ফেডের রাজনৈতিক নিরপেক্ষতা এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখার ক্ষেত্রে তার স্বায়ত্তশাসনকে আরও শক্তিশালী করেছে। দ্বিতীয়ত, অন্যান্য স্বাধীন সংস্থার ক্ষেত্রে, বিশেষ করে যেগুলির প্রধান একক ব্যক্তি দ্বারা পরিচালিত হয়, আদালত রাষ্ট্রপতির অপসারণ ক্ষমতাকে বাড়িয়ে দিয়েছে। এই সিদ্ধান্তের মূল যুক্তি ছিল যে, সংবিধানে নির্বাহী ক্ষমতা রাষ্ট্রপতির হাতে ন্যস্ত এবং স্বাধীন সংস্থাগুলির প্রধানদের বরখাস্ত করার ক্ষেত্রে রাষ্ট্রপতির ক্ষমতাকে অতিরিক্তভাবে সীমাবদ্ধ করা উচিত নয়, কারণ এতে রাষ্ট্রপতির সাংবিধানিক দায়িত্ব পালনে বাধা সৃষ্টি হতে পারে।
এই রায় ফেডারেল আমলাতন্ত্রের ওপর রাষ্ট্রপতির নিয়ন্ত্রণকে উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়ে দেবে। সমালোচকরা আশঙ্কা করছেন যে, এর ফলে ভবিষ্যতে কোনো রাষ্ট্রপতি, বিশেষত ডোনাল্ড ট্রাম্পের মতো একজন যিনি ‘ডিপ স্টেট’ বা আমলাতান্ত্রিক প্রতিরোধের সমালোচনা করে এসেছেন, তিনি তার রাজনৈতিক এজেন্ডা বাস্তবায়নের জন্য স্বাধীন সংস্থাগুলির ওপর আরও বেশি প্রভাব খাটাতে পারবেন। প্রাক্তন এফটিসি কমিশনাররা ইতিমধ্যেই ক্ষমতার অপব্যবহারের সম্ভাবনার বিষয়ে সতর্ক করেছেন। এই সিদ্ধান্তের ফলে বিভিন্ন সংস্থায় রাজনৈতিক আনুগত্যের ভিত্তিতে নিয়োগ ও বরখাস্তের ঘটনা বাড়তে পারে, যা সংস্থাগুলির নিরপেক্ষতা এবং দক্ষতা হ্রাস করতে পারে। নীতি নির্ধারণে রাজনৈতিক প্রভাব বৃদ্ধির ফলে জনগণের স্বার্থের পরিবর্তে দলীয় স্বার্থ প্রাধান্য পাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
এই রায় ডোনাল্ড ট্রাম্পের মতো নেতাদের জন্য একটি বড় বিজয় হিসেবে দেখা হচ্ছে, যারা দীর্ঘদিন ধরে ফেডারেল আমলাতন্ত্রের ওপর রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা বাড়ানোর পক্ষে সওয়াল করে আসছেন। এটি ভবিষ্যতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের শাসনব্যবস্থায় একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা করতে পারে, যেখানে নির্বাহী ক্ষমতা আরও শক্তিশালী হবে এবং স্বাধীন সংস্থাগুলির স্বায়ত্তশাসন কিছুটা হলেও খর্ব হবে। এই সিদ্ধান্ত কেবল বর্তমান প্রশাসন নয়, ভবিষ্যতের সকল প্রশাসনের জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ এবং সুযোগ তৈরি করবে। এটি ক্ষমতা বিভাজন এবং চেকস অ্যান্ড ব্যালেন্সের সাংবিধানিক নীতিগুলির উপর নতুন করে আলোচনার জন্ম দেবে, এবং ফেডারেল সরকারে রাষ্ট্রপতির ভূমিকা নিয়ে আইনি ও রাজনৈতিক বিতর্ক আরও তীব্র করবে।
দেশনেত্র দৃষ্টি ছাড়িয়ে