প্রফেসর ড. শিরীন আখতার
একটি দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার গুণগত পরিবর্তন নির্ভর করে শিক্ষকের মানসম্মত প্রশিক্ষণের ওপর। কিন্তু আমাদের বর্তমান শিক্ষক প্রশিক্ষণ কারিকুলামে শিক্ষার্থীদের (প্রশিক্ষণার্থী শিক্ষকদের) ‘টেবিলমুখী’ করার প্রচলিত পদ্ধতিটি মূলত নোট মুখস্থ আর কাগজের স্তূপ জমানোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ। আমাদের প্রয়োজন এমন এক শিক্ষানীতি, যা প্রশিক্ষণার্থীদের কেবল লাইব্রেরিতে বসিয়ে রাখবে না, বরং তাদের টেবিলকে একটি ‘ইনোভেটিভ ল্যাব’ হিসেবে গড়ে তুলবে।
দীর্ঘ পেশা জীবনে শ্রেণি কার্যক্রমে দেখেছি প্রশিক্ষণার্থীরা তাত্ত্বিক কথার চেয়ে বাস্তব অভিজ্ঞতার গল্প বেশি পছন্দ করেন। প্রশ্ন করে উত্তরে পেয়েছি তাঁরা চান প্রশিক্ষণ হোক আনন্দদায়ক ,আধুনিক, চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় সক্ষম করে তোলা। প্রস্তাব দিয়েছেন- থর্নডাইড , প্যাভলভ,স্কিনার, পিঁয়াজের… বিভিন্ন মতবাদগুলো মুখস্ত না করে কীভাবে প্রয়োগ করবেন, কীভাবে এআই ব্যবহার করে আধুনিক পাঠদান করবেন, কেস স্টাডি বিশ্লেষণ করবেন, কোন কঠিন বিষয়ে কীভাবে লেসন প্ল্যান ডিজাইন করবেন, প্রতিফলনমূলক ডায়েরি করে ভবিষ্যতে নিজের ক্লাসে প্রয়োগ করে সফল শিক্ষক হয়ে উঠতে পারবেন? শিক্ষক প্রশিক্ষনার্থীদের পাঠ্যবই গবেষণামুখী করতে প্রায়োগিক শিক্ষা ও কর্মমুখী কারিকুলামের অপরিহার্যতা নিয়ে প্রশ্ন নেই। পাঠ্যসূচিতে বাস্তবভিত্তিক ছোট ছোট গবেষণা, প্রজেক্ট, গ্রুপ স্টাডি, নিয়মিত কুইজ, প্রেজেন্টেশনে সক্রিয় রাখা খুব জরুরি। Work based learning ক্যারিয়ারে কাজে আসে।
শিক্ষা ব্যবস্থায় কাউন্সিলিং, মেন্টরশিপ, ডিজিটাল ইন্টারঅ্যাক্টিভ লার্নিং, ফিল্ড ওয়ার্ক, পরিদর্শন এবং তাদেরই ইন্টারভিউ নেবার ব্যবস্থা, গ্রুপ কোলাবরেশন, গ্যামিফিকেশন, রোল প্লে স্ক্রিপ্ট,চূড়ান্ত পরীক্ষার চাপে না রেখে নিয়মিত মূল্যায়ন, ক্লাসরুম সিমুলেশন রিপোর্ট, ডিজিটাল কনটেন্ট ও অ্যানিমেশন তৈরি … এই ধরনের আয়োজনগুলো সত্যিকার অর্থে শিক্ষককে তৈরি করবে- “শ্রেণিকক্ষের শিল্পী” হিসেবে! এটা হবে পড়া নয় ।পড়ানোর প্রস্তুতি।
সক্রিয় শিখনের উপরে আর কিছু হয় না।
উন্নত বিশ্বের তুলনামূলক চিত্র:
বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় শিক্ষা ব্যবস্থাগুলোর দিকে তাকালে দেখা যায়, সেখানে প্রশিক্ষণ কেন ‘শ্রেণিকক্ষ-কেন্দ্রিক’:
ফিনল্যান্ড: এখানে প্রশিক্ষণার্থীদের বাড়ির কাজ হিসেবে কোনো বইয়ের সারাংশ লিখতে দেওয়া হয় না। বরং তাদের কাজ হলো কোনো একটি ক্লাসের ভিডিও দেখে তার ওপর ‘রিফ্লেক্টিভ অ্যানালাইসিস’ করা-অর্থাৎ শিক্ষক কোথায় ভালো করেছেন আর কোথায় উন্নতি দরকার, তা খুঁজে বের করা।
সিঙ্গাপুর ও জাপান: জাপানে ‘জুুগিও কেনকিউ’ (Lesson Study) পদ্ধতির মাধ্যমে প্রশিক্ষণার্থীরা বাড়িতে বসে একটি আদর্শ পাঠদান নকশা (Lesson Design) তৈরি করেন এবং সহকর্মীদের সঙ্গে তা নিয়ে গবেষণা করেন। তাদের অ্যাসাইনমেন্টের বড় অংশই হলো বাস্তব সমস্যার সমাধান (Action Research)।
আমাদের করণীয়: প্রশিক্ষণার্থীদের দিতে হবে আকর্ষণীয় সৃজনশীল বাড়ির কাজ।
তাদের ‘টেবিলমুখী’ ও গবেষণাধর্মী করতে আমরা নিচের ৩টি কাজ অন্তর্ভুক্ত করতে পারি:
* মাইক্রো-টিচিং প্রোডাকশন: কোনো জটিল বিষয় (যেমন: গণিতের জ্যামিতি বা বিজ্ঞানের সূত্র) ৫ মিনিটে সহজে বোঝানোর একটি ভিডিও বা মডেল তৈরি করা। অন্যান্যগুলো সাবজেক্ট অনুযায়ী হবে।
* কেস-স্টাডি রিপোর্ট: নিজ এলাকার একজন ঝরে পড়া বা পিছিয়ে পড়া শিক্ষার্থীর সাথে কথা বলে তার সমস্যা সমাধানের একটি ‘অ্যাকশন প্ল্যান’ তৈরি করা।
* ডিজিটাল রিসোর্স কিউরেটিং: ইন্টারনেটে থাকা হাজারো তথ্যের ভেতর থেকে নির্দিষ্ট ক্লাসের উপযোগী সেরা শিক্ষাপোকরণ বাছাই করে একটি ‘ডিজিটাল লার্নিং কিট’ তৈরি করা।
নীতিনির্ধারকদের প্রতি আবেদন-সুপারিশ:
শিক্ষক প্রশিক্ষণ কারিকুলাম পরিমার্জন এখন সময়ের দাবি। বিবেচ্য হবে মূল্যায়নের ক্ষেত্রে ‘তাত্ত্বিক পরীক্ষা’ কমিয়ে ‘ব্যবহারিক ও সৃজনশীল প্রজেক্টে’ নম্বর বাড়ানো। শিক্ষকদের টেবিলমুখী করার অর্থ যেন কেবল বই পড়া না হয়, বরং তা যেন হয় আগামীদিনের আধুনিক শ্রেণিকক্ষ গড়ার প্রস্তুতিতে। শিক্ষক প্রশিক্ষণ কারিকুলাম পরিমার্জনে মুখস্ত নির্ভর আয়োজনের পরিবর্তে অ্যাসাইনমেন্ট বনাম সৃজনশীল শ্রেণিকক্ষ গড়ার কারিগর হিসেবে গতি পাক। শিক্ষকদের টেবিলই হোক ল্যাব -ওয়ার্কশপ!
শিক্ষকদের উদ্দেশ্যে
একটি বিশেষ অনুরোধ যুক্ত করতে চাই, তাঁরা যেন পরিবর্তনকে ভয় না পেয়ে একে আলিঙ্গন করেন।
প্রফেসর ড.শিরীন আখতার
বিভাগীয় প্রধান,শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ বিভাগ, এশিয়ান ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ
দেশনেত্র দৃষ্টি ছাড়িয়ে