হোলি আর্টিজানের বীর শহীদ: মুছে যাচ্ছে কি তাঁদের স্মৃতিচিহ্ন?

হোলি আর্টিজানের বীর শহীদ: মুছে যাচ্ছে কি তাঁদের স্মৃতিচিহ্ন?

২০১৬ সালের ১ জুলাই ঢাকার গুলশানের হোলি আর্টিজান বেকারিতে ইতিহাসের এক নৃশংস জঙ্গি হামলায় দেশের নিরাপত্তা রক্ষায় আত্মোৎসর্গকারী দুই বীর পুলিশ কর্মকর্তার স্মৃতিচিহ্ন মুছে যাওয়ার ঘটনা গভীর উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। তৎকালীন ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশের জ্যেষ্ঠ সহকারী কমিশনার (এসি) রবিউল করিম এবং বনানী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সালাউদ্দিন জঙ্গিদের গ্রেনেড ও গুলিতে প্রাণ হারান। তাঁদের বীরত্বপূর্ণ আত্মত্যাগের স্মরণে ২০১৮ সালে গুলশান থানার সামনে নির্মিত হয়েছিল ‘দীপ্ত শপথ’ ভাস্কর্য। কিন্তু সম্প্রতি জুলাই মাসের গণ-অভ্যুত্থানের পর এই ভাস্কর্যটি ভেঙে ফেলা হয়েছে এবং ডিবি কার্যালয়ের প্রধান ফটক থেকে শহীদ রবিউল করিমের নামফলকও সরিয়ে ফেলা হয়েছে, যা জাতীয় কৃতজ্ঞতার প্রতি প্রশ্ন তুলেছে।

হোলি আর্টিজানের সেই ভয়াবহ রাতে জঙ্গিরা ১৭ জন বিদেশি নাগরিকসহ মোট ২২ জনকে নির্মমভাবে হত্যা করে। ইতালির ৯ জন, জাপানের ৭ জন, ভারতের ১ জন এবং যুক্তরাষ্ট্রের ১ জন নাগরিক এই হামলায় প্রাণ হারান। এই সংকটময় মুহূর্তে পুলিশ সদস্যরা নিজেদের জীবন বাজি রেখে পরিস্থিতি মোকাবিলায় ঝাঁপিয়ে পড়েন। এসি রবিউল করিম এবং ওসি সালাউদ্দিনের আত্মত্যাগ শুধু পুলিশ বাহিনীর সদস্যদের নয়, সমগ্র জাতিকে গভীরভাবে নাড়া দিয়েছিল। তাঁদের এই বীরোচিত ভূমিকা সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে বাংলাদেশের দৃঢ় অবস্থান এবং পদক্ষেপকে আন্তর্জাতিক মহলে ইতিবাচকভাবে তুলে ধরেছিল, যা দেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করতে সহায়ক হয়েছিল। বিশ্ববাসী যেমন শহীদদের প্রতি সমবেদনা জানিয়েছিল, তেমনি পুলিশ বাহিনীর সাহসিকতাও ব্যাপক প্রশংসা কুড়িয়েছিল।

দেশের জন্য জীবন উৎসর্গকারী বীরদের স্মৃতি অমর করে রাখতে বিভিন্ন সময়ে সরকার ও জনগণের পক্ষ থেকে নানা উদ্যোগ নেওয়া হয়। ‘দীপ্ত শপথ’ ভাস্কর্যটি ছিল এমনই একটি উদ্যোগ। ভাস্কর মৃণাল হক কর্তৃক নির্মিত এই ভাস্কর্যটি প্রতি বছর পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ও বিভিন্ন দেশের হাইকমিশনারদের শ্রদ্ধা জানানোর একটি কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছিল। এটি কেবল একটি ভাস্কর্য ছিল না, বরং এটি ছিল অকুতোভয় পুলিশ সদস্যদের দেশপ্রেম, সাহসিকতা এবং মানবিকতার এক জীবন্ত স্মারক, যা ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে ইতিহাস জানতে এবং দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হতে প্রেরণা দিত। ডিবি কার্যালয়ের মূল ফটকে রবিউলের নামফলকও একই ধরনের ঐতিহাসিক গুরুত্ব বহন করত।

তবে, ২০২৪ সালের জুলাই মাসের গণ-অভ্যুত্থানের পর দেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এক বড় পরিবর্তন আসে। এই পরিবর্তনের ঢেউয়ে ‘দীপ্ত শপথ’ ভাস্কর্যটি ভেঙে ফেলা হয় এবং ডিবি কার্যালয়ের প্রধান ফটক থেকে রবিউল করিমের নামটিও মুছে ফেলা হয়। এই ঘটনার পর থেকে গুলশান থানার সামনে সেই স্মৃতিস্তম্ভের স্থানে আর কেউ শ্রদ্ধা জানাতে যান না। এমনকি, এই দুই বীর পুলিশ কর্মকর্তার স্মরণে নতুন কোনো স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণেরও কোনো উদ্যোগ দেখা যায়নি। এ ধরনের ঘটনা কেবল অতীতের স্মৃতিকেই নয়, বরং জাতীয় বীরদের প্রতি আমাদের সম্মিলিত শ্রদ্ধাবোধকেও প্রশ্নবিদ্ধ করে তোলে। যুগে যুগে যাঁরা দেশ ও মানুষের জন্য প্রাণ দিয়েছেন, তাঁরা আর কোনো নির্দিষ্ট পরিবারের গণ্ডিতে আবদ্ধ থাকেন না; তাঁরা হয়ে ওঠেন সমগ্র জাতির সন্তান, গর্ব ও সম্মানের প্রতীক।

শহীদ রবিউল করিমের ছোট ভাই শামসুজ্জামান শামস, যিনি নিজেও একজন সাংবাদিক, এই ঘটনায় গভীর হতাশা ব্যক্ত করেছেন। তবে তিনি সম্পূর্ণভাবে আশাহত নন। তিনি জানান, পুলিশ বাহিনীর অনেক সদস্য এখনও নিয়মিত তাঁদের পরিবারের খোঁজখবর নেন এবং সংকটের সময় পাশে দাঁড়ান। বিভিন্ন দল ও মতের মানুষ এবং সাধারণ জনগণের ভালোবাসাও তাঁদের যেকোনো সংকট মোকাবিলায় শক্তি জোগায়। সম্প্রতি, ২০২৪ সালের ১ জুলাই পূর্বের ‘দীপ্ত শপথ’ ভাস্কর্যের স্থানে একদল শিক্ষার্থী শ্রদ্ধা নিবেদন করে, যা আশার আলো জাগায়। এছাড়াও, একই দিনে রবিউলের নিজ গ্রাম কাটিগ্রামে তাঁর প্রতিষ্ঠিত বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের স্কুল ‘ব্লুমস কাটিগ্রাম’-এ বিভিন্ন অনুষ্ঠানের মাধ্যমে তাঁকে গভীর শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায় স্মরণ করা হয়। এভাবেই ব্যক্তিগত ও সামাজিক উদ্যোগে রবিউলদের স্মৃতি বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টা চলছে।

এই পরিস্থিতিতে, শহীদ রবিউল ও সালাউদ্দিন এবং হোলি আর্টিজানে আহত অন্যান্য অকুতোভয় পুলিশ সদস্যদের আত্মত্যাগের ইতিহাস ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে তুলে ধরার জন্য বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন সরকার এবং পুলিশ বাহিনীর কাছে জোর দাবি উঠেছে। তাঁদের আত্মত্যাগ যেন নিছক পারিবারিক স্মৃতিতে সীমাবদ্ধ না থাকে, বরং তাঁদের দেশের সম্পদ হিসেবে জাতীয়ভাবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। তাঁদের বীরত্বগাঁথা যেন আমাদের পথপ্রদর্শক হয়ে চিরকাল বেঁচে থাকে, যা দেশকে সন্ত্রাসমুক্ত ও নিরাপদ রাখতে অনুপ্রেরণা জোগাবে। ইতিহাস মুছে ফেলার প্রবণতা নয়, বরং ইতিহাসকে ধারণ ও সংরক্ষণ করার মাধ্যমেই একটি জাতি তার ভবিষ্যৎ নির্মাণ করতে পারে।

এছাড়াও

কলোরাডো প্রাইমারিতে গণতান্ত্রিক সমাজতান্ত্রিক প্রার্থীর চমকপ্রদ জয়: ১৫ মেয়াদের কংগ্রেস সদস্যের পতন

কলোরাডো প্রাইমারিতে গণতান্ত্রিক সমাজতান্ত্রিক প্রার্থীর চমকপ্রদ জয়: ১৫ মেয়াদের কংগ্রেস সদস্যের পতন

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কলোরাডো রাজ্যের সাম্প্রতিক প্রাইমারি নির্বাচনগুলি রাজনৈতিক অঙ্গনে এক নতুন মোড় এনে দিয়েছে, যেখানে …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *