বিশ্বখ্যাত গাড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠান হোন্ডা এবার তাদের ব্যবসায়িক কৌশলে এক ঐতিহাসিক ও যুগান্তকারী পরিবর্তন এনেছে। প্রথাগত গাড়ি উৎপাদনের গণ্ডি পেরিয়ে জাপানি এই বহুজাতিক জায়ান্টটি এখন ডেটা সেন্টারের মতো অত্যন্ত লাভজনক জ্বালানি সংরক্ষণ (এনার্জি স্টোরেজ) বাজারে নিজেদের অবস্থান দৃঢ় করতে চাইছে। চলতি সপ্তাহেই প্রতিষ্ঠানটি ডেটা সেন্টারের জন্য বিশেষভাবে তৈরি ব্যাটারি ও বিদ্যুৎ ব্যাকআপ সিস্টেমের উৎপাদন শুরু করেছে। এই ব্যাটারিগুলো সাধারণ সড়ক বা গ্যারেজে থাকা বৈদ্যুতিক গাড়ির (ইভি) পরিবর্তে বৃহৎ তথ্যপ্রযুক্তি অবকাঠামো এবং ডেটা সেন্টারে ব্যবহার করা হবে।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) এবং ক্লাউড কম্পিউটিংয়ের অভূতপূর্ব প্রসারের ফলে বিশ্বজুড়ে ডেটা সেন্টারের চাহিদা আকাশচুম্বী হয়েছে। এই ডেটা সেন্টারগুলো দিনরাত সচল রাখতে এবং নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে বিপুল পরিমাণ শক্তির প্রয়োজন হয়। হোন্ডা মূলত এই ক্রমবর্ধমান চাহিদাকেই ব্যবসায়িক সুযোগ হিসেবে গ্রহণ করেছে। তাদের উৎপাদিত হাইড্রোজেন ফুয়েল সেল এবং উন্নত ব্যাটারি প্রযুক্তি এখন থেকে ডেটা সেন্টারের ব্যাকআপ পাওয়ার বা বিকল্প বিদ্যুৎ উৎস হিসেবে কাজ করবে, যা গ্রিড বিপর্যয় বা বিদ্যুৎ বিভ্রাটের সময়ও বিশ্বের বড় বড় সার্ভারগুলোকে সচল রাখবে।
বাজার বিশ্লেষকদের মতে, বিশ্বব্যাপী বৈদ্যুতিক গাড়ির বাজারে তীব্র প্রতিযোগিতা এবং ইভি বিক্রির গতি কিছুটা মন্থর হওয়ার কারণে হোন্ডা তাদের পোর্টফোলিও বৈচিত্র্যময় করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ডেটা সেন্টারের জন্য ব্যাটারি উৎপাদন কেবল একটি নতুন পণ্য নয়, বরং এটি হোন্ডার জন্য সম্পূর্ণ নতুন এক আয়ের উৎস উন্মোচন করবে। জ্বালানি সংরক্ষণ বা ‘স্টেশনারি এনার্জি স্টোরেজ সিস্টেম’ (ইএসএস) বাজারটি বর্তমানে ট্রিলিয়ন ডলারের শিল্পে পরিণত হওয়ার পথে রয়েছে এবং হোন্ডা এই সুযোগ হাতছাড়া করতে চায় না।
পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তির দিকে ধাবিত হওয়াও হোন্ডার এই নতুন উদ্যোগের অন্যতম বড় কারণ। প্রতিষ্ঠানটি ২০৫০ সালের মধ্যে তাদের সমস্ত কার্যক্রম এবং উৎপাদিত পণ্যের ক্ষেত্রে কার্বন নিঃসরণ শূন্যে নামিয়ে আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। ডেটা সেন্টারগুলো সাধারণত প্রচুর কার্বন নির্গমন করে থাকে। হোন্ডার পরিবেশবান্ধব হাইড্রোজেন ফুয়েল সেল এবং উন্নত ব্যাটারি প্রযুক্তি ব্যবহারের ফলে এই ডেটা সেন্টারগুলোর পরিবেশগত ক্ষতিকর প্রভাব অনেকটাই হ্রাস পাবে।
এই পদক্ষেপের মাধ্যমে হোন্ডা সরাসরি মার্কিন প্রযুক্তি জায়ান্ট টেসলার মতো প্রতিদ্বন্দ্বীদের মুখোমুখি হচ্ছে, যারা ইতিমধ্যেই তাদের ‘মেগাপ্যাক’ ব্যাটারির মাধ্যমে এনার্জি স্টোরেজ বাজারে বড় অংশ দখল করে আছে। তবে অটোমোবাইল খাতের দীর্ঘ অভিজ্ঞতা এবং জাপানি উন্নত প্রযুক্তিগত দক্ষতার কারণে হোন্ডা এই বাজারে দ্রুত নিজেদের আধিপত্য বিস্তার করতে পারবে বলে আশাবাদী প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞরা। আগামী দিনে গাড়ি নির্মাতাদের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি অবকাঠামো খাতে এমন রূপান্তর বিশ্ব অর্থনীতিতে নতুন মাত্রা যোগ করবে।
দেশনেত্র দৃষ্টি ছাড়িয়ে