চট্টগ্রামের কর্ণফুলী নদীতে নোঙর করা একটি মাছ ধরার নৌযানে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় দগ্ধ হয়ে দুই নাবিকের মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে। উন্নত চিকিৎসার জন্য তাঁদের চট্টগ্রাম থেকে ঢাকার জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে নেওয়ার পথে গতকাল মঙ্গলবার সন্ধ্যায় এই হৃদয়বিদারক ঘটনা ঘটে। নিহত নাবিকরা হলেন এফভি দেশ নামের ওই নৌযানের গ্রিজার (ইঞ্জিন বিভাগের কারিগরি কর্মী) মো. রুবেল (৩২) এবং নাবিক শাহ আলম (৪০)। একই ঘটনায় গুরুতর দগ্ধ হয়েছেন নৌযানের প্রকৌশলী আশিকুজ্জামান তামিম, যিনি বর্তমানে ঢাকার ওই হাসপাতালেই চিকিৎসাধীন। চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, তাঁর শরীরের শতভাগ দগ্ধ হওয়ায় অবস্থা অত্যন্ত আশঙ্কাজনক।
জাহাজের ক্যাপ্টেন জুবায়ের মাহমুদ আজ বুধবার সকালে দুই নাবিকের মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, বিস্ফোরণে দগ্ধ তিন নাবিককে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকায় পাঠানো হয়েছিল, যার মধ্যে দুজন পথেই শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। নিহত রুবেলের বাড়ি পটুয়াখালীর গলাচিপা উপজেলায়। আজ সকাল ১০টায় সেখানে তাঁর জানাজা শেষে দাফন সম্পন্ন হয়েছে। অন্যদিকে, শাহ আলমের বাড়ি নোয়াখালী জেলায়। আজ সকাল ৮টায় তাঁর জানাজা শেষে দাফন করা হয়। এই ঘটনা মৎস্যজীবী সমাজে গভীর শোকের ছায়া ফেলেছে।
গত মঙ্গলবার বেলা পৌনে ১টার দিকে চট্টগ্রামের সদরঘাট এলাকায় কর্ণফুলী নদীতে নোঙর করা এফভি দেশ নামের একটি মাছ ধরার ট্রলারে আকস্মিক বিস্ফোরণের পর আগুন ধরে যায়। মুহূর্তেই আগুনের লেলিহান শিখা নৌযানটিকে গ্রাস করে। এই দুর্ঘটনায় এফভি দেশ নৌযানের ক্যাডেট প্রকৌশলী আশিকুজ্জামান তামিম, নাবিক মো. রুবেল, শাহ আলম গুরুতর দগ্ধ হন। এছাড়া, পাশেই নোঙর করা এফভি ডিজনি নামের আরেকটি নৌযানের তিন নাবিক নিজাম উদ্দিন, মো. রাসেল ও ছিদ্দিক আহমেদও দগ্ধ হন।
ঘটনার পরপরই আহত ছয় নাবিককে দ্রুত উদ্ধার করে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইউনিটে ভর্তি করা হয়। তাঁদের মধ্যে প্রকৌশলী আশিকুজ্জামান, নাবিক রুবেল ও শাহ আলমের অবস্থা অত্যন্ত গুরুতর হওয়ায় চিকিৎসকরা তাঁদের ঢাকায় স্থানান্তরের পরামর্শ দেন। তবে, দুর্ভাগ্যবশত, তাঁদের ঢাকায় নেওয়ার পথেই রুবেল ও শাহ আলমের মৃত্যু হয়। বাকি তিন নাবিক, নিজাম উদ্দিন, মো. রাসেল ও ছিদ্দিক আহমেদ চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালেই চিকিৎসাধীন ছিলেন। তাঁদের অবস্থা আশঙ্কামুক্ত হওয়ায় আজ সকালে হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র দেওয়া হয়েছে বলে নিশ্চিত করেছেন চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইউনিটের প্রধান মোহাম্মদ এস খালেদ।
বর্তমানে দগ্ধ প্রকৌশলী আশিকুজ্জামান তামিম ঢাকার জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে নিবিড় পর্যবেক্ষণে রয়েছেন। ইনস্টিটিউটের আবাসিক চিকিৎসক শাওন বিন রহমান তাঁর সংকটাপন্ন অবস্থার কথা জানিয়েছেন। এই ধরনের মাছ ধরার নৌযানে অগ্নিকাণ্ড ও বিস্ফোরণের ঘটনা নতুন নয়। প্রায়শই পুরোনো ইঞ্জিন, জ্বালানি তেলের অনিরাপদ সংরক্ষণ, বৈদ্যুতিক ত্রুটি বা কর্মীদের পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ ও নিরাপত্তা সরঞ্জামের অভাবে এমন দুর্ঘটনা ঘটে থাকে। মৎস্য আহরণ দেশের অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ খাত হলেও, এসব নৌযানের নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং কর্মীদের ঝুঁকি নিরসনে আরও কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ জরুরি বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।
নৌ পরিবহন অধিদপ্তর, ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স এবং স্থানীয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে এই ঘটনার একটি পুঙ্খানুপুঙ্খ তদন্ত পরিচালনার প্রয়োজন রয়েছে। দুর্ঘটনার সঠিক কারণ উদঘাটন এবং ভবিষ্যতে এমন মর্মান্তিক ঘটনা রোধে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা অত্যন্ত জরুরি। এই দুর্ঘটনা আবারও সামুদ্রিক পেশার ঝুঁকি এবং কর্মীদের জীবন সুরক্ষার গুরুত্বকে সামনে এনেছে, যা কর্তৃপক্ষের জন্য গভীর চিন্তার বিষয়।
দেশনেত্র দৃষ্টি ছাড়িয়ে