হোলি আর্টিজান ট্র্যাজেডি: ফাঁসি থেকে আমৃত্যু কারাদণ্ড, চূড়ান্ত নিষ্পত্তির অপেক্ষায় লিভ টু আপিল

হোলি আর্টিজান ট্র্যাজেডি: ফাঁসি থেকে আমৃত্যু কারাদণ্ড, চূড়ান্ত নিষ্পত্তির অপেক্ষায় লিভ টু আপিল

দেশনেত্র ডেস্ক রিপোর্ট :

রাজধানীর গুলশানের কূটনৈতিক এলাকায় অবস্থিত হোলি আর্টিজান বেকারিতে ইতিহাসের অন্যতম নৃশংস ও ভয়াবহ জঙ্গি হামলার প্রায় এক দশক পূর্ণ হতে চলেছে। দেশ-বিদেশে আলোড়ন সৃষ্টিকারী এই বর্বরোচিত হত্যাকাণ্ডের বিচারিক প্রক্রিয়া এখন দেশের সর্বোচ্চ আদালত তথা আপিল বিভাগের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় রয়েছে। বিচারিক আদালতে এ মামলায় নিষিদ্ধঘোষিত নব্য জেএমবির সাত সদস্যকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হলেও পরবর্তীতে উচ্চ আদালত (হাইকোর্ট) সেই সাজা কমিয়ে আমৃত্যু কারাদণ্ড প্রদান করেন। হাইকোর্টের এই রায়ের বিরুদ্ধে আমৃত্যু কারাদণ্ডপ্রাপ্ত জীবিত ছয় আসামির দায়ের করা ‘লিভ টু আপিল’ (আপিলের অনুমতি চেয়ে আবেদন) বর্তমানে শুনানির অপেক্ষায় রয়েছে।

আইনি পরিভাষায় ‘লিভ টু আপিল’ হলো আপিল করার আনুষ্ঠানিক অনুমতি প্রার্থনা। আপিল বিভাগ যদি আসামিদের এই আবেদনগুলো শুনানির পর গ্রহণ করে, তবেই মামলাটি পূর্ণাঙ্গ আপিল হিসেবে শুনানির জন্য বিবেচিত হবে। আর যদি এই আবেদন খারিজ হয়ে যায়, তবে হাইকোর্টের দেওয়া আমৃত্যু কারাদণ্ডের রায়ই বহাল থাকবে। ফলে, হোলি আর্টিজান মামলার চূড়ান্ত আইনি নিষ্পত্তি এখন সম্পূর্ণরূপে আপিল বিভাগের পরবর্তী সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করছে। এই মামলার আন্তর্জাতিক গুরুত্ব বিবেচনা করে রাষ্ট্রপক্ষও শুনানির প্রক্রিয়া দ্রুত শুরু করার জন্য উদ্যোগ গ্রহণ করছে বলে জানা গেছে।

২০১৬ সালের ১ জুলাই রাতে গুলশানের হোলি আর্টিজান বেকারিতে আকস্মিক হামলা চালায় একদল সশস্ত্র জঙ্গি। সেই অন্ধকার রাতে তারা ১৭ জন বিদেশি নাগরিকসহ মোট ২০ জন নিরীহ মানুষকে অত্যন্ত নৃশংসভাবে হত্যা করে। নিহতদের মধ্যে ৯ জন ইতালীয়, ৭ জন জাপানি, ১ জন ভারতীয় এবং ৩ জন বাংলাদেশি নাগরিক ছিলেন। জিম্মিদের উদ্ধার করতে গিয়ে জঙ্গিদের ছোঁড়া গ্রেনেড ও গুলিতে প্রাণ হারান পুলিশের দুই ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা। পরদিন সকালে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর নেতৃত্বাধীন ‘অপারেশন থান্ডারবোল্ট’ নামক বিশেষ অভিযানে পাঁচ হামলাকারী জঙ্গি নিহত হয় এবং ১৩ জন জিম্মিকে জীবিত উদ্ধার করা সম্ভব হয়।

এই ঘটনার পর দায়েরকৃত মামলায় ২০১৯ সালের ২৭ নভেম্বর ঢাকার সন্ত্রাসবিরোধী বিশেষ ট্রাইব্যুনাল নব্য জেএমবির সাত সদস্যকে মৃত্যুদণ্ডের আদেশ দেন। পরবর্তীতে ডেথ রেফারেন্স ও আসামিদের আপিল শুনানি শেষে ২০২৩ সালের ৩০ অক্টোবর হাইকোর্ট রায় ঘোষণা করেন। হাইকোর্ট বিচারিক আদালতের দেওয়া মৃত্যুদণ্ড হ্রাস করে সাত আসামিকে আমৃত্যু কারাদণ্ড এবং প্রত্যেককে ৫০ হাজার টাকা করে অর্থদণ্ড প্রদান করেন। অর্থদণ্ড অনাদায়ে তাঁদের আরও পাঁচ বছরের সশ্রম কারাদণ্ডের নির্দেশ দেওয়া হয়।

আমৃত্যু কারাদণ্ডপ্রাপ্ত এই সাত আসামি হলেন—রাকিবুল হাসান ওরফে রিগ্যান, মো. জাহাঙ্গীর হোসেন ওরফে রাজীব গান্ধী, আসলাম হোসেন ওরফে র্যাশ, হাদিসুর রহমান, আবদুস সবুর খান ওরফে সোহেল মাহফুজ, মামুনুর রশীদ ওরফে রিপন এবং শরিফুল ইসলাম খালেদ। তবে সাম্প্রতিক এক রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে আসামিদের একজন নিহত হয়েছেন। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পরদিন, অর্থাৎ ৬ আগস্ট গাজীপুরের কাশিমপুর হাই সিকিউরিটি কারাগারে বন্দীদের বিক্ষোভ ও পালানোর চেষ্টার সময় রক্ষীদের গুলিতে আসলাম হোসেন ওরফে র্যাশ নিহত হন। ফলে বর্তমানে জীবিত ছয় আসামির লিভ টু আপিল শুনানির অপেক্ষায় রয়েছে।

হাইকোর্টের পূর্ণাঙ্গ রায়ে উল্লেখ করা হয়, হোলি আর্টিজান হামলার মূল পরিকল্পনাকারী, অর্থ ও অস্ত্র সরবরাহকারী এবং হামলাকারীদের প্রশিক্ষক হিসেবে এই আসামিদের অপরাধ প্রসিকিউশন পক্ষ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করতে পেরেছে। তবে সরাসরি হামলায় অংশ নেওয়া পাঁচ জঙ্গি সেনা অভিযানেই নিহত হওয়ায় তাদের বিচার করা সম্ভব হয়নি। হাইকোর্টের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, যেহেতু আপিলকারী সাতজন সরাসরি হত্যাকাণ্ডে অংশ নেননি, তাই ‘একই অভিপ্রায়’ বা কমন ইনটেনশনের ভিত্তিতে তাদের মৃত্যুদণ্ড দেওয়া আইনগতভাবে সঠিক ছিল না। তবে এই হামলার ভয়াবহতা, নৃশংসতা এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হওয়ার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে আসামিদের আমৃত্যু কারাদণ্ড দেওয়াই ন্যায়বিচারের পরিপন্থী নয় বলে আদালত মনে করেন।

এছাড়াও

ঢাকায় স্থানান্তরের পথে দুই নাবিকের মর্মান্তিক মৃত্যু, দগ্ধ প্রকৌশলী সংকটাপন্ন

ঢাকায় স্থানান্তরের পথে দুই নাবিকের মর্মান্তিক মৃত্যু, দগ্ধ প্রকৌশলী সংকটাপন্ন

চট্টগ্রামের কর্ণফুলী নদীতে নোঙর করা একটি মাছ ধরার নৌযানে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় দগ্ধ হয়ে দুই …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *