হোলি আর্টিজান হামলার এক দশক: বাংলাদেশের জঙ্গিবাদের চিত্রপট কি বদলেছে?

হোলি আর্টিজান হামলার এক দশক: বাংলাদেশের জঙ্গিবাদের চিত্রপট কি বদলেছে?

আজ থেকে ঠিক এক দশক আগে, ২০১৬ সালের ১লা জুলাই, বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকার গুলশানের হোলি আর্টিজান বেকারিতে এক ভয়াবহ সন্ত্রাসী হামলা পুরো জাতিকে স্তম্ভিত করে তুলেছিল। বিদেশি নাগরিকসহ ২২ জনকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয় সেই রাতে, যা দেশের ইতিহাসে জঙ্গিবাদের এক কালো অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত। এই হামলার দশম বার্ষিকীতে প্রশ্ন উঠেছে, গত এক দশকে বাংলাদেশে জঙ্গি তৎপরতা কি কমেছে নাকি নতুন রূপে এর বিস্তার ঘটেছে? এই প্রশ্নটি দেশের বর্তমান নিরাপত্তা পরিস্থিতি এবং সন্ত্রাস দমনে সরকারের নেওয়া পদক্ষেপগুলো নিয়ে গভীর আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

হোলি আর্টিজান হামলা ছিল বাংলাদেশের জঙ্গিবাদের ইতিহাসে এক নজিরবিহীন ঘটনা। এই হামলায় দেশীয় জঙ্গি গোষ্ঠী নব্য জেএমবি জড়িত ছিল, যারা আন্তর্জাতিক জঙ্গি সংগঠন আইএসের আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে এই নৃশংসতা চালিয়েছিল। হামলার পর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তাৎক্ষণিক ও ব্যাপক অভিযান শুরু করে। পরবর্তী মাসগুলোতে ‘অপারেশন স্টর্ম ২৬’, ‘অপারেশন টোয়াইলাইট’ সহ অসংখ্য সফল অভিযানের মাধ্যমে নব্য জেএমবির শীর্ষস্থানীয় নেতাসহ বহু জঙ্গিকে নির্মূল বা গ্রেপ্তার করা হয়। সরকার সন্ত্রাস দমনে ‘কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি)’ ইউনিটের মতো বিশেষায়িত বাহিনী গঠন করে এবং গোয়েন্দা নজরদারি জোরদার করে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, হোলি আর্টিজান হামলার পর থেকে বাংলাদেশে বড় ধরনের কোনো সন্ত্রাসী হামলার ঘটনা ঘটেনি, যা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সক্ষমতা বৃদ্ধির একটি বড় প্রমাণ। সন্ত্রাস দমনে তাদের ধারাবাহিক অভিযান, উন্নত গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ এবং প্রযুক্তিগত সক্ষমতা জঙ্গিদের সাংগঠনিক কাঠামোকে দুর্বল করে দিয়েছে। অনেক শীর্ষ নেতা নিহত বা গ্রেপ্তার হওয়ায় জঙ্গিদের পক্ষে বড় ধরনের হামলা পরিচালনা করা কঠিন হয়ে পড়েছে। এছাড়াও, জনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং ধর্মীয় নেতাদের মাধ্যমে জঙ্গিবাদবিরোধী বার্তা প্রচারেও ইতিবাচক প্রভাব পড়েছে।

তবে অনেক নিরাপত্তা বিশ্লেষক মনে করেন, জঙ্গিবাদের মূল শেকড় পুরোপুরি উপড়ে ফেলা সম্ভব হয়নি, বরং এর ধরন পরিবর্তিত হয়েছে। বড় হামলার পরিবর্তে এখন ছোট ছোট সেল বা ‘লোন উলফ’ হামলার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে তরুণদের উগ্রপন্থায় দীক্ষিত করার চেষ্টা এখনও সক্রিয়। নতুন নতুন আঞ্চলিক বা আন্তর্জাতিক জঙ্গি গোষ্ঠীর আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে কিছু তরুণ এখনও এই পথে পা বাড়াচ্ছে। জঙ্গিরা এখন আরও গোপনে এবং বিচ্ছিন্নভাবে তাদের কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে, যা তাদের শনাক্ত করাকে আরও চ্যালেঞ্জিং করে তুলেছে।

জঙ্গিবাদ দমনে বাংলাদেশ সরকার, বিশেষ করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী যে সাফল্য দেখিয়েছে, তা অনস্বীকার্য। তবে, এই যুদ্ধ এখনও শেষ হয়নি। উগ্রবাদী মতাদর্শের বিস্তার রোধে শুধু সামরিক অভিযানই যথেষ্ট নয়, প্রয়োজন সামাজিক, অর্থনৈতিক ও শিক্ষামূলক উদ্যোগের সমন্বয়। তরুণদের মধ্যে হতাশা, বেকারত্ব এবং বঞ্চনার অনুভূতি অনেক সময় তাদের জঙ্গিবাদের দিকে ঠেলে দেয়। তাই, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে সুস্থ সমাজ গঠনে মনোযোগ দেওয়া জরুরি।

দেশের বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকার, যার নেতৃত্বে রয়েছেন প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস, জাতীয় নিরাপত্তা এবং সন্ত্রাসবাদ দমনের বিষয়টিকে গুরুত্বের সাথে দেখছে। এই সরকার পূর্ববর্তী সরকারের গৃহীত ভালো পদক্ষেপগুলো অব্যাহত রাখবে এবং নতুন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সাথে সহযোগিতা আরও জোরদার করবে বলে আশা করা যায়। হোলি আর্টিজান হামলার দশম বার্ষিকী আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, জঙ্গিবাদ একটি বৈশ্বিক সমস্যা এবং এর মোকাবিলায় নিরন্তর সজাগ দৃষ্টি, কঠোর পদক্ষেপ এবং জনসম্পৃক্ততা অপরিহার্য। বাংলাদেশের জন্য এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় দীর্ঘমেয়াদী এবং টেকসই কৌশল গ্রহণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

এছাড়াও

ঢাকায় স্থানান্তরের পথে দুই নাবিকের মর্মান্তিক মৃত্যু, দগ্ধ প্রকৌশলী সংকটাপন্ন

ঢাকায় স্থানান্তরের পথে দুই নাবিকের মর্মান্তিক মৃত্যু, দগ্ধ প্রকৌশলী সংকটাপন্ন

চট্টগ্রামের কর্ণফুলী নদীতে নোঙর করা একটি মাছ ধরার নৌযানে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় দগ্ধ হয়ে দুই …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *