মহানবীর আমলে মদিনা রাষ্ট্রের আয়ের উৎস ও ব্যয়ের খাত
ছবি:দেশনেত্র

মহানবীর আমলে মদিনা রাষ্ট্রের আয়ের উৎস ও ব্যয়ের খাত

প্রভাষক মোঃ আল মামুন

মহানবী মুহাম্মাদ (সা.)-এর নেতৃত্বে মদিনা রাষ্ট্র (৬২২-৬৩২ খ্রিস্টাব্দ) ছিল একটি আদর্শ ইসলামী রাষ্ট্রের প্রাথমিক রূপ। রাষ্ট্রের আর্থিক ব্যবস্থা ছিল সরল, স্বচ্ছ ও ন্যায়ভিত্তিক। নিম্নে আয়ের উৎস ও ব্যয়ের খাতসমূহ বিশদভাবে আলোচনা করা হলো:

আয়ের উৎসসমূহ:

১. যাকাত:

এটি ইসলামের পাঁচ স্তম্ভের একটি এবং রাষ্ট্রীয় কোষাগারের প্রধান উৎস।
· সম্পদশালী মুসলমানদের উপর বছরে একবার ফরয করা হতো। যাকাত প্রদানের নির্দিষ্ট নিসাব (সীমা) ও হার ছিল।
· যাকাত সংগ্রহ করা হতো নগদ টাকা, সোনা-রূপা, পশু (উট, গরু, ছাগল), ফসল, পণ্যদ্রব্য ইত্যাদি থেকে।

২. সাদাকাতুল ফিতর (ফিতরা):

· রমজান মাসের শেষে ঈদুল ফিতরের আগে প্রত্যেক স্বাধীন, প্রাপ্তবয়স্ক মুসলমানের উপর ওয়াজিব।

৩. খুমুস (গণিমতের এক-পঞ্চমাংশ):

· যুদ্ধে লব্ধ সম্পদ (গণিমত) এর এক-পঞ্চমাংশ রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা হতো। বাকি চার-পঞ্চমাংশ যোদ্ধাদের মধ্যে বণ্টন করা হতো।
· খুমুস আল্লাহ, রাসূল, রাসূলের আত্মীয়, এতিম, মিসকিন ও মুসাফিরদের জন্য বরাদ্দ ছিল (সূরা আনফাল: ৪১)।

৪. ফাই (যুদ্ধবিহীন লব্ধ সম্পদ):

· শত্রুপক্ষের কাছ থেকে কোনো যুদ্ধ ছাড়াই প্রাপ্ত সম্পদ। যেমন, বনু নাদির গোত্রের সম্পদ (যারা চুক্তি ভঙ্গ করেছিল) ফাই হিসেবে রাষ্ট্রীয় কোষাগারে গিয়েছিল। এর পুরোটাই রাষ্ট্রের অধীনে থাকত এবং জনকল্যাণে ব্যয় হতো।

৫. খারাজ (কৃষিজমির কর):

· বিজিত অঞ্চলের অমুসলিমদের কৃষিজমির উপর ধার্যকৃত ভূমি কর। যেমন, খাইবার বিজয়ের পর সেখানকার ইহুদি চাষিদের জমি চাষের অনুমতি দেওয়া হয়েছিল শর্তসাপেক্ষে খারাজ প্রদানের বিনিময়ে।

৬. জিজিয়া (প্রতিরক্ষা কর):

· অমুসলিম নাগরিক (যিম্মি) যারা রাষ্ট্রের নিরাপত্তা লাভ করতেন এবং সামরিক সেবা থেকে মুক্ত ছিলেন, তারা করদাতা হিসেবে জিজিয়া প্রদান করতেন। এটি ছিল সামর্থ্য অনুযায়ী ধাপকৃত ও ন্যায়সঙ্গত।

৭. উশর (ভূমি কর, মুসলিম জমির মালিকদের জন্য):

· মুসলিম কৃষকদের ফসলের দশমাংশ (উশর) কোষাগারে জমা হতো। সেচের মাধ্যমে উৎপাদিত ফসলের ক্ষেত্রে এই হার অর্ধেক (৫%) করা হতো।

৮. স্বেচ্ছাশুদ্ধা ও উপহার:

· সাহাবায়ে কেরাম প্রায়ই নিজেদের অর্থ-সম্পদ রাসূল (সা.)-এর কাছে দান করতেন, যা রাষ্ট্রীয় কাজে লাগতো। তবে এটি বাধ্যতামূলক নয়, স্বতঃস্ফূর্ত দান ছিল।

৯. রাষ্ট্রীয় সম্পদের আয়:

· রাষ্ট্রীয় উদ্যান, খেজুর বাগান (যেমন ‘ফাদাক’-এর সম্পদ) থেকে আয়।

ব্যয়ের খাতসমূহ:

১. দরিদ্র, অভাবগ্রস্ত ও দুঃস্থদের ভরণ-পোষণ:

· দরিদ্র, এতিম, বিধবা, অসহায়দের নিয়মিত ভাতা প্রদান।

২. রাষ্ট্রীয় প্রশাসন ব্যয়:

· কর্মকর্তা, কর্মচারী, লেখক, বিচারক, শিক্ষকদের ভাতা ও বেতন।
· রাষ্ট্রদূত প্রেরণ, চিঠি পাঠানো ইত্যাদি পরিচালনা ব্যয়।

৩. সামাজিক নিরাপত্তা ও কল্যাণমূলক কাজ:

· দাস মুক্তিকরণে আর্থিক সহায়তা।
· ঋণগ্রস্তদের ঋণ পরিশোধে সাহায্য।
· মুসাফির ও পথচারীদের সাহায্য।

৪. সামরিক ব্যয়:

· সৈন্যদের রসদ, অস্ত্র, বাহন ও ভাতা প্রদান।
· সীমান্ত নিরাপত্তা ও দুর্গ নির্মাণ।

৫. জনগণের অবকাঠামো উন্নয়ন:

· কূপ খনন, মসজিদ নির্মাণ, পথ তৈরির কাজ।
· বনু কুরাইজা গোত্রের জমি থেকে প্রাপ্ত অর্থ দ্বারা মসজিদে নববী সম্প্রসারণ করা হয়েছিল।

৬. আপৎকালীন তহবিল:

· দুর্ভিক্ষ, খরা বা অন্যান্য প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময় সহায়তা দেওয়া।

৭. রাষ্ট্রপ্রধান ও তার পরিবারের ব্যয়:

· রাসূল (সা.) ও তার পরিবারের অত্যন্ত নিয়ন্ত্রিত ও সহজ জীবনযাপনের ব্যয়। তিনি প্রায়ই নিজের প্রয়োজনের চেয়ে অন্যের প্রয়োজনে বেশি ব্যয় করতেন।

৮. আত্মীয়-স্বজন ও সাহাবাদের সাহায্য:

· রাসূল (সা.)-এর কিছু আত্মীয় যারা দরিদ্র ছিলেন, তাদের সহায়তা দেওয়া হতো। মুহাজির সাহাবাদেরও আর্থিক সহযোগিতা করা হতো।

৯. ধর্মীয় ও শিক্ষামূলক কার্যক্রম:

· ইসলামী জ্ঞান প্রচার, শিক্ষক নিয়োগ ও ইসলামী কেন্দ্র স্থাপন।

আর্থিক ব্যবস্থাপনার বৈশিষ্ট্য:

১. কেন্দ্রীয় বাইতুল মাল (রাষ্ট্রীয় কোষাগার):

· মসজিদে নববীতে প্রধান কোষাগার থাকত। আবু বকর সিদ্দিক (রা.), উমর ইবনুল খাত্তাব (রা.), বিলাল ইবনে রাবাহ (রা.) প্রমুখ এর তত্ত্বাবধায়ক ছিলেন।
· সকল আয় এখানে জমা হতো এবং প্রাপ্য ব্যক্তি ও খাতে বণ্টন করা হতো।

২. স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা:

· রাসূল (সা.) সব ব্যয়ের হিসাব রাখতেন এবং জনগণের সম্পদে কোনো অনিয়ম সহ্য করতেন না।

৩. নৈতিক ভিত্তি:

· রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে রাসূল (সা.) নিজে কোষাগার থেকে ব্যক্তিগত প্রয়োজনে অতিরিক্ত কিছু গ্রহণ করতেন না। তাঁর জীবনযাত্রা ছিল সাধারণ মানুষের চেয়েও সহজ।

৪. ন্যায়বিচার:

· অমুসলিম নাগরিকদের কর (জিজিয়া) ধার্য করা হতো তাদের সামর্থ্য অনুযায়ী, এবং বিনিময়ে তাদের নিরাপত্তা ও ধর্মীয় স্বাধীনতা দেওয়া হতো।

৫. অতিসত্বর বণ্টন:

· কোষাগারে সম্পদ জমা হওয়ার পর দ্রুত প্রয়োজনে বিতরণ করা হতো, সঞ্চয় করা হতো না।

উদাহরণ:

· বনু নাদিরের ফাই সম্পদ: পুরোটাই রাষ্ট্রীয় খাতে গিয়েছিল এবং মুহাজির সাহাবাদের মধ্যে বণ্টনের আগে রাষ্ট্রীয় প্রয়োজনে ব্যবহৃত হয়েছিল।
· খাইবারের খারাজ: স্থানীয় ইহুদি কৃষকরা ফসলের অর্ধেক দিত, যা রাষ্ট্রীয় আয় হিসেবে ব্যবহৃত হতো।মদিনা রাষ্ট্রের আর্থিক ব্যবস্থা ছিল একটি ভারসাম্যপূর্ণ, ন্যায়ভিত্তিক ও কল্যাণমূলক মডেল। এর কেন্দ্রে ছিল সামাজিক সুবিচার, দরিদ্রদের অধিকার নিশ্চিতকরণ ও সম্পদের সুষম বণ্টন। এটি কোনো কর আদায়ের যান্ত্রিক ব্যবস্থা নয়, বরং একটি নৈতিক-ধর্মীয় দায়িত্ববোধের উপর প্রতিষ্ঠিত ছিল, যা পরবর্তী ইসলামী খিলাফতের আর্থিক নীতির ভিত্তি রচনা করে।

লেখক : মোঃ আল মামুন,(শিক্ষক ও গবেষক) প্রভাষক,ইসলামের ইতিহাস ও সভ্যতা বিভাগ,এশিয়ান ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ।

এছাড়াও

মাসব্যাপি ইফতারের আয়োজন করেছে ৫ নং ওয়ার্ড যুবদল

মাসব্যাপি ইফতারের আয়োজন করেছে ৫ নং ওয়ার্ড যুবদল

নিজস্ব প্রতিনিধি: রাজধানীতে পবিত্র রমজান মাস উপলক্ষে এতিম, অসহায়, ভাসমান ও সুবিধাবঞ্চিতদের জন্য ঢাকা মহানগর …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *