ট্রাম্পের শীতলতার মুখে তুরস্কে ন্যাটোর শীর্ষ সম্মেলন: জোটের ভবিষ্যৎ নিয়ে গভীর অনিশ্চয়তা

ট্রাম্পের শীতলতার মুখে তুরস্কে ন্যাটোর শীর্ষ সম্মেলন: জোটের ভবিষ্যৎ নিয়ে গভীর অনিশ্চয়তা

ন্যাটোর ভবিষ্যৎ নিয়ে গভীর অনিশ্চয়তা এবং অভ্যন্তরীণ চ্যালেঞ্জের আবহে তুরস্কের মাটিতে অনুষ্ঠিত হচ্ছে সামরিক জোট ন্যাটোর এক গুরুত্বপূর্ণ শীর্ষ সম্মেলন। এই সম্মেলন এমন এক সময়ে অনুষ্ঠিত হচ্ছে, যখন জোটের অন্যতম প্রভাবশালী সদস্য যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ন্যাটোর প্রতি তার সমালোচনামূলক মনোভাব অব্যাহত রেখেছেন, যা জোটের ঐক্য ও সংহতি নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে। বিশ্বজুড়ে চলমান ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা, বিশেষ করে ইউক্রেন যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে এই শীর্ষ সম্মেলনকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

ডোনাল্ড ট্রাম্প, যিনি আগামী মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে পুনরায় প্রার্থী হওয়ার দৌড়ে রয়েছেন, ন্যাটোর প্রতিরক্ষা ব্যয় নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই অসন্তোষ প্রকাশ করে আসছেন। তার মতে, ইউরোপীয় দেশগুলো প্রতিরক্ষা খাতে পর্যাপ্ত অর্থ ব্যয় করছে না এবং যুক্তরাষ্ট্রের ওপর অতিরিক্ত বোঝা চাপাচ্ছে। তার ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতির অংশ হিসেবে, তিনি কেবল ব্যয় ভাগাভাগি নয়, বরং জোটের প্রতি ‘আনুগত্য’ প্রদর্শনের ওপরও জোর দিয়েছেন। ট্রাম্পের এই মনোভাব ন্যাটোর ভবিষ্যৎ কার্যকারিতা এবং সদস্য রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে পারস্পরিক আস্থা নিয়ে গভীর উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে, বিশেষ করে যদি তিনি পুনরায় হোয়াইট হাউসে প্রবেশ করেন। তার সমালোচনামূলক অবস্থান জোটের দীর্ঘমেয়াদী স্থিতিশীলতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে এবং সদস্য রাষ্ট্রগুলোকে একটি সম্ভাব্য নতুন বাস্তবতার জন্য প্রস্তুত থাকতে বাধ্য করছে।

এই সংকটময় মুহূর্তে শীর্ষ সম্মেলনের আয়োজক হিসেবে তুরস্কের ভূমিকা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। ভূ-রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে থাকা তুরস্ক, কৃষ্ণসাগর অঞ্চলে চলমান যুদ্ধ এবং মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতার প্রেক্ষাপটে ন্যাটোর কাছে তার কৌশলগত গুরুত্ব বাড়িয়ে তুলেছে। অতীতে তুরস্কের সঙ্গে ন্যাটোর সম্পর্ক কিছু বিষয়ে জটিল ছিল, যেমন রাশিয়ার কাছ থেকে এস-৪০০ ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ক্রয় অথবা সুইডেন ও ফিনল্যান্ডের ন্যাটো সদস্যপদ লাভে প্রাথমিক বিরোধিতা। তবে, এই শীর্ষ সম্মেলন আয়োজনের মাধ্যমে তুরস্ক বৈশ্বিক মঞ্চে তার কূটনৈতিক প্রভাব বাড়ানোর এবং পশ্চিমা জোটের সঙ্গে তার সম্পর্ক পুনর্গঠনের সুযোগ পাচ্ছে। দেশটির ভৌগোলিক অবস্থান এবং আঞ্চলিক প্রভাব ন্যাটোর নিরাপত্তা কৌশলে একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ।

ন্যাটোর মহাসচিব জেনস স্টলটেনবার্গ এই সম্মেলনে সদস্য রাষ্ট্রগুলোর প্রতি তাদের প্রতিরক্ষা ব্যয় মোট দেশজ উৎপাদনের (GDP) ২ শতাংশে উন্নীত করার জন্য বিশ্বাসযোগ্য পরিকল্পনা উপস্থাপনের আহ্বান জানিয়েছেন। অনেক সদস্য রাষ্ট্র এখনও এই লক্ষ্যমাত্রা পূরণে ব্যর্থ, যা জোটের সম্মিলিত প্রতিরক্ষা সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করে। ইউক্রেন যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে ইউরোপের নিরাপত্তা পরিস্থিতি দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে এবং রাশিয়ার আগ্রাসন ন্যাটোর অস্তিত্বের যৌক্তিকতা প্রমাণ করলেও, অভ্যন্তরীণ বিভেদ এবং ট্রাম্পের মতো নেতাদের ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতি জোটের ঐক্যকে দুর্বল করতে পারে। স্টলটেনবার্গ জোর দিয়ে বলেছেন যে, সম্মিলিত প্রতিরক্ষা নিশ্চিত করতে প্রতিটি সদস্য রাষ্ট্রকে তাদের ন্যায্য অংশ বহন করতে হবে।

আল জাজিরার মতো আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো প্রশ্ন তুলেছে, এই শীর্ষ সম্মেলন কি ন্যাটোকে ‘ভাঙনের মুখে’ ঠেলে দেবে? জোটের ৭৬ বছরের ইতিহাসে এটি সম্ভবত অন্যতম কঠিন সময়। ইউক্রেনে রাশিয়ার যুদ্ধ ন্যাটোর জন্য একটি অভূতপূর্ব চ্যালেঞ্জ, যা জোটের সংকল্প এবং প্রতিরোধ ক্ষমতা পরীক্ষা করছে। একদিকে যেমন জোট সম্প্রসারিত হচ্ছে (সুইডেন ও ফিনল্যান্ডের অন্তর্ভুক্তি), অন্যদিকে অভ্যন্তরীণ চাপ এবং ভবিষ্যৎ মার্কিন নীতির অনিশ্চয়তা এর দীর্ঘমেয়াদী স্থিতিশীলতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করছে। সদস্য রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে মতবিরোধ এবং ভিন্ন ভিন্ন জাতীয় স্বার্থ জোটের সামগ্রিক লক্ষ্য অর্জনে বাধা সৃষ্টি করতে পারে।

তুরস্কে অনুষ্ঠিত এই ন্যাটো শীর্ষ সম্মেলন কেবল বর্তমান চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলা করবে না, বরং জোটের ভবিষ্যৎ গতিপথও নির্ধারণ করবে। সদস্য রাষ্ট্রগুলোকে অবশ্যই প্রতিরক্ষা ব্যয় বাড়ানো, অভিন্ন নিরাপত্তা হুমকি মোকাবিলায় ঐক্যবদ্ধ থাকা এবং ট্রাম্পের মতো নেতাদের সম্ভাব্য প্রভাব মোকাবিলায় একটি সুসংহত কৌশল তৈরি করতে হবে। এই সম্মেলন থেকে কী বার্তা আসে, তা বিশ্ব নিরাপত্তা এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলবে, যা আগামী দশকের জন্য পশ্চিমা বিশ্বের প্রতিরক্ষা ও কূটনীতির চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করবে।

এছাড়াও

ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ খামেনেইয়ের জানাজায় শোকাহত জনতার ঢল, তেহরানে বিশাল শোকমিছিল

ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ খামেনেইয়ের জানাজায় শোকাহত জনতার ঢল, তেহরানে বিশাল শোকমিছিল

ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনেইয়ের জানাজার নামাজে অংশ নিতে তেহরানের রাজপথে নেমে আসে লাখো …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *