কয়েক মাস ধরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ক্রমবর্ধমান উত্তেজনার মধ্যেই ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির বিশাল অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া শুরু হয়েছে। তেহরানসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে আয়োজিত এই ছয় দিনের শোক অনুষ্ঠানে লাখ লাখ মানুষের সমাগম হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে, যা ইরানের রাজনৈতিক ও ধর্মীয় জীবনে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করবে। এই অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া কেবল একজন নেতার শেষকৃত্য নয়, বরং ইরানের ক্ষমতা, ঐক্য এবং আঞ্চলিক প্রভাব প্রদর্শনের একটি বিশাল মঞ্চ হিসেবেও বিবেচিত হচ্ছে।
আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি, যিনি প্রায় ৩৫ বছর ধরে লৌহমুষ্টিতে ইরান শাসন করেছেন এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বারবার সংঘাতপূর্ণ অবস্থানে গিয়েছেন, তার মৃত্যু দেশের ভেতরের ও বাইরের রাজনীতিতে গভীর প্রভাব ফেলবে। তার দীর্ঘ শাসনামলে ইরান পারমাণবিক কর্মসূচি থেকে শুরু করে আঞ্চলিক প্রক্সি যুদ্ধ পর্যন্ত বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ নীতি গ্রহণ করেছে, যা মধ্যপ্রাচ্য এবং আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে একটি শক্তিশালী চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করেছে। তার নেতৃত্বেই ইরান ‘প্রতিরোধের অক্ষ’ (Axis of Resistance) হিসেবে পরিচিত আঞ্চলিক মিত্রদের একটি নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছে, যা যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের নীতির বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে।
অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার প্রথম দিন থেকেই তেহরানের রাস্তায় শোকাহত জনস্রোত দেখা গেছে। কালো পোশাক পরিহিত লাখ লাখ মানুষ খামেনির প্রতি তাদের শ্রদ্ধা জানাতে একত্রিত হয়েছে। এই বিশাল শোকমিছিলগুলো ইরানের ধর্মীয় ও রাজনৈতিক নেতৃত্বের প্রতি জনগণের আনুগত্য প্রদর্শনের একটি প্রতীকী বার্তা বহন করে। ধারণা করা হচ্ছে, দেশের পবিত্র শহর কোম এবং মাশহাদসহ অন্যান্য স্থানেও অনুরূপ বিশাল সমাবেশ অনুষ্ঠিত হবে, যেখানে খামেনির মরদেহ নিয়ে যাওয়া হবে এবং ধর্মীয় রীতিনীতি মেনে শেষকৃত্য সম্পন্ন হবে। এই ধরনের গণজমায়েত ইরানের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং সর্বোচ্চ নেতার প্রতি জনসমর্থনের একটি সুস্পষ্ট চিত্র তুলে ধরে।
তবে এই বিশাল আয়োজনের মাঝে আন্তর্জাতিক মহলে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বিশেষভাবে আলোচিত হচ্ছে। জানা গেছে, চীনের, রাশিয়ার এবং তুরস্কের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা খামেনির দাফন অনুষ্ঠানে অনুপস্থিত রয়েছেন। ইরান সাধারণত এই দেশগুলোকে তার কৌশলগত মিত্র হিসেবে দেখে। এমন পরিস্থিতিতে তাদের অনুপস্থিতি বিভিন্ন কূটনৈতিক মহলে জল্পনা-কল্পনার জন্ম দিয়েছে। এটি কি কোনো কূটনৈতিক বার্তা, নাকি আঞ্চলিক ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এই দেশগুলোর সতর্ক অবস্থান? এই প্রশ্নগুলো আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছে। এই অনুপস্থিতি ইরানের ভবিষ্যতের পররাষ্ট্রনীতি এবং আঞ্চলিক জোটের ওপর কী প্রভাব ফেলবে, তা সময়ই বলে দেবে।
খামেনির উত্তরসূরি নির্বাচন ইরানের জন্য একটি অত্যন্ত সংবেদনশীল প্রক্রিয়া হবে। বিশেষজ্ঞদের পরিষদ (Assembly of Experts) নতুন সর্বোচ্চ নেতা নির্বাচন করবে, যিনি কেবল ধর্মীয় পণ্ডিতই নন, বরং দেশের রাজনৈতিক ও সামরিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপরও পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ রাখবেন। এই নির্বাচন ইরানের অভ্যন্তরীণ ক্ষমতা কাঠামো, পারমাণবিক কর্মসূচি এবং আঞ্চলিক নীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন আনতে পারে। বিশ্ব এখন গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছে যে, নতুন নেতৃত্ব ইরানের সঙ্গে পশ্চিমা বিশ্বের সম্পর্ককে কোন দিকে নিয়ে যায় এবং মধ্যপ্রাচ্যের অস্থির পরিস্থিতিতে এটি কী ধরনের প্রভাব ফেলে। খামেনির অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া শেষ হলেও, তার উত্তরাধিকার এবং তার উত্তরসূরিকে ঘিরে অনিশ্চয়তা ইরানের জন্য এক নতুন চ্যালেঞ্জের দ্বার উন্মোচন করছে।
দেশনেত্র দৃষ্টি ছাড়িয়ে