দেশনেত্র নিউজ ডেস্ক :
সম্প্রতি কাতারে এক ভয়াবহ সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারানো পাঁচ বাংলাদেশি কর্মীর মরদেহ দেশে এসে পৌঁছেছে। গত কাল রাতে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে তাদের কফিনবাহী বিমান অবতরণ করে, যা স্বজনদের আহাজারিতে এক শোকাবহ পরিবেশের সৃষ্টি করে। প্রিয়জনদের নিথর দেহ দেখে বিমানবন্দরে উপস্থিত পরিবার ও পরিজনদের কান্নার রোল আকাশ-বাতাস ভারী করে তোলে, যা উপস্থিত সকলের মনে গভীর বেদনার সঞ্চার করে।
জানা গেছে, গত সপ্তাহের শুরুতে কাতারের আল-খোর এলাকার কাছে এক মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনায় এই পাঁচ বাংলাদেশি প্রাণ হারান। তারা কর্মস্থল থেকে আবাসস্থলে ফিরছিলেন বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে। একটি দ্রুতগামী পিকআপ ভ্যান নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে বিপরীত দিক থেকে আসা আরেকটি গাড়ির সাথে মুখোমুখি সংঘর্ষে লিপ্ত হলে এই ভয়াবহ দুর্ঘটনা ঘটে। ঘটনাস্থলেই তাদের মৃত্যু হয়, এবং তাদের পরিচয় শনাক্ত করতে কিছুটা সময় লাগে। কাতারের স্থানীয় প্রশাসন দুর্ঘটনার কারণ খতিয়ে দেখতে তদন্ত শুরু করেছে বলে জানা গেছে।
নিহতরা হলেন আব্দুল্লাহ (৩০), রহিম মিয়া (৩২), করিম শেখ (২৮), শফিকুর রহমান (৩৫) ও রিয়াজ উদ্দিন (৩১)। তারা বাংলাদেশের বিভিন্ন জেলা যেমন নোয়াখালী, কুমিল্লা, চট্টগ্রাম, ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও সিলেটের বাসিন্দা ছিলেন। প্রত্যেকেই নিজেদের পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি হিসেবে উন্নত জীবনের আশায় এবং পরিবারের মুখে হাসি ফোটাতে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে প্রবাসে পাড়ি জমিয়েছিলেন। তাদের অকাল মৃত্যুতে শুধু পরিবার নয়, গোটা গ্রামজুড়ে নেমে এসেছে শোকের ছায়া। তাদের পরিবারগুলো এখন গভীর অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে, কারণ তাদের আয়ের প্রধান উৎস আকস্মিকভাবে বন্ধ হয়ে গেছে।
বাংলাদেশ দূতাবাস, কাতার সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগ এবং ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় দীর্ঘ আইনি ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়া শেষে তাদের মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হয়েছে। দূতাবাসের পক্ষ থেকে নিহতদের পরিবারকে সব ধরনের আইনি ও আর্থিক সহায়তা প্রদানের আশ্বাস দেওয়া হয়েছে। শাহজালাল বিমানবন্দরে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধিরা এবং ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডের কর্মকর্তারা উপস্থিত থেকে মরদেহগুলো পরিবারের কাছে হস্তান্তরের ব্যবস্থা করেন। এই প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে বেশ কিছুদিন সময় লেগেছে, যা পরিবারগুলোর অপেক্ষার প্রহরকে আরও দীর্ঘায়িত করেছিল।
বিমানবন্দরে স্বজনদের কান্না ও আহাজারিতে এক হৃদয়বিদারক দৃশ্যের অবতারণা হয়। প্রিয়জনের নিথর দেহ দেখে অনেকেই জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন। নিহতদের পরিবার এখন অনিশ্চিত ভবিষ্যতের মুখোমুখি। একদিকে প্রিয়জন হারানোর অপূরণীয় বেদনা, অন্যদিকে পরিবারের আর্থিক নিরাপত্তা নিয়ে গভীর উদ্বেগ তাদের গ্রাস করেছে। অনেকেই সরকারের কাছে ক্ষতিপূরণ এবং নিহতদের পরিবারের পুনর্বাসনের জন্য বিশেষ সহায়তার আবেদন জানিয়েছেন।
মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে কর্মরত বাংলাদেশি শ্রমিকদের সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণহানির ঘটনা নতুন নয়। কাজের চাপ, দীর্ঘ কর্মঘণ্টা, ট্রাফিক আইন সম্পর্কে অসচেতনতা এবং অনেক ক্ষেত্রে চালকদের বেপরোয়া মনোভাব এ ধরনের দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ। প্রবাসে শ্রমিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবং তাদের অধিকার রক্ষায় দূতাবাসগুলোকে আরও সক্রিয় ভূমিকা পালনের আহ্বান জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা। একইসাথে, প্রবাসীদের নিজেদেরও স্থানীয় ট্রাফিক আইন সম্পর্কে সচেতন থাকা এবং কর্মক্ষেত্রে সতর্কতার সাথে চলাচলের গুরুত্ব তুলে ধরা হয়েছে।
প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, নিহতদের পরিবারকে সরকার নির্ধারিত ক্ষতিপূরণ এবং অন্যান্য সহায়তা প্রদান করা হবে। একইসাথে, ভবিষ্যতে এ ধরনের দুর্ঘটনা এড়াতে প্রবাসীদের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি এবং সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর ট্রাফিক আইন মেনে চলার বিষয়ে জোর দেওয়া হচ্ছে। এই মর্মান্তিক ঘটনা আবারও প্রবাস জীবনের কঠিন বাস্তবতা এবং ঝুঁকিগুলোকে সামনে এনেছে। পাঁচ পরিবারের স্বপ্নভঙ্গের এই বেদনা হয়তো কোনোদিন পূরণ হওয়ার নয়, তবে তাদের স্মৃতি ও আত্মত্যাগ দেশের অর্থনীতিতে প্রবাসীদের অবদানের এক করুণ স্মারক হয়ে থাকবে।
দেশনেত্র দৃষ্টি ছাড়িয়ে